বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করবে—এমন দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যে জুলাই সনদে বিএনপি স্বাক্ষর করেছে, সেই সনদের প্রতিটি অক্ষর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেলে বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত এক বড় জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা ১১টি কমিশনের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কমিশনের মধ্যে সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও নারী উন্নয়নসহ নানা খাত রয়েছে। তার অভিযোগ, কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে শুধু সংবিধান নিয়ে কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। অথচ স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ সরবরাহ, প্রশাসন সংস্কার বা আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন নিয়ে তারা তেমন কথা বলে না।
তিনি আরও বলেন, নারীর স্বাধীনতা ও উন্নয়ন নিয়ে বাস্তব কাজ করার বিষয়ে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি দেশের মানুষ যেন সহজে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পায়, সেই লক্ষ্যে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৬ বছরে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং অসংখ্য মামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে। সে সময় মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ রাজপথে নেমে আসে এবং সেই আন্দোলনের ফলেই রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে।
দুর্নীতির প্রসঙ্গেও কঠোর মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, আগের সরকার বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং সেই দায়িত্ব নিয়ে সরকার নতুনভাবে দেশ গড়ার কাজ শুরু করেছে।
সরকারের নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপও তিনি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড চালু, কৃষি কার্ড প্রদান এবং সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ। এছাড়া মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ধর্মগুরুদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে এবং কম খরচে বিদেশে জনশক্তি পাঠাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
সংস্কারের বিষয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতির সামনে একটি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো বিমান চলাচল চালুর পরিকল্পনার কথা জানান, যাতে কৃষিপণ্য সহজে বিদেশে রপ্তানি করা যায়। পাশাপাশি বগুড়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং সেখানে কৃষিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন বিভাগ চালুর প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী আরও কয়েকটি উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে ছিল বগুড়া প্রেসক্লাবের নতুন ভবন, বাইতুর রহমতান সেন্ট্রাল জামে মসজিদের পুনর্নির্মাণ কাজ, বগুড়া বার সমিতির বহুতল ভবন এবং সাত জেলায় ই-বেলবন্ড কার্যক্রম চালু। এছাড়া বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন, যা স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
পটভূমি হিসেবে উল্লেখযোগ্য যে, বগুড়া জেলা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর স্মৃতিবিজড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত। ফলে রাজনৈতিকভাবে এই অঞ্চলে দলের কর্মসূচি ও জনসভাগুলো সাধারণত বড় আকারে অনুষ্ঠিত হয় এবং জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বগুড়ার জনসভা থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব বিষয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। এখন এসব ঘোষণার বাস্তব অগ্রগতি কীভাবে হয়, সেটিই আগামী দিনে রাজনৈতিক ও জনমতের বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে।

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
বিএনপি জুলাই সনদের প্রতিটি শব্দ বাস্তবায়ন করবে—এমন দৃঢ় অঙ্গীকার করেছেন প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেন, সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় যে জুলাই সনদে বিএনপি স্বাক্ষর করেছে, সেই সনদের প্রতিটি অক্ষর ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে। সোমবার (২০ এপ্রিল) বিকেলে বগুড়া শহরের আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠে আয়োজিত এক বড় জনসভায় তিনি এ কথা বলেন।
জনসভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের করা ১১টি কমিশনের কাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব কমিশনের মধ্যে সংবিধান, বিচার ব্যবস্থা, প্রশাসন, স্বাস্থ্য ও নারী উন্নয়নসহ নানা খাত রয়েছে। তার অভিযোগ, কিছু মানুষ ইচ্ছাকৃতভাবে শুধু সংবিধান নিয়ে কথা বলে জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। অথচ স্বাস্থ্যসেবা, ওষুধ সরবরাহ, প্রশাসন সংস্কার বা আইনশৃঙ্খলা উন্নয়ন নিয়ে তারা তেমন কথা বলে না।
তিনি আরও বলেন, নারীর স্বাধীনতা ও উন্নয়ন নিয়ে বাস্তব কাজ করার বিষয়ে বিএনপি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। পাশাপাশি দেশের মানুষ যেন সহজে চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় ওষুধ পায়, সেই লক্ষ্যে কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নেও সরকার গুরুত্ব দিচ্ছে।
বক্তব্যে অতীতের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ১৬ বছরে বিএনপির অনেক নেতা-কর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং অসংখ্য মামলা মোকাবিলা করতে হয়েছে। সে সময় মানুষের বাকস্বাধীনতা ও ভোটাধিকার বাধাগ্রস্ত হয়েছিল বলে তিনি দাবি করেন। তিনি বলেন, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মাধ্যমে জনগণ রাজপথে নেমে আসে এবং সেই আন্দোলনের ফলেই রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটে।
দুর্নীতির প্রসঙ্গেও কঠোর মন্তব্য করেন তিনি। তার অভিযোগ, আগের সরকার বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। তবে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জনগণ বিএনপিকে দায়িত্ব দিয়েছে এবং সেই দায়িত্ব নিয়ে সরকার নতুনভাবে দেশ গড়ার কাজ শুরু করেছে।
সরকারের নেওয়া কয়েকটি পদক্ষেপও তিনি তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড চালু, কৃষি কার্ড প্রদান এবং সুদসহ কৃষি ঋণ মওকুফ। এছাড়া মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় উপাসনালয়ের ধর্মগুরুদের জন্য সম্মানীর ব্যবস্থা করা হয়েছে বলেও জানান তিনি। সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে এবং কম খরচে বিদেশে জনশক্তি পাঠাতে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আলোচনা চলছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।
সংস্কারের বিষয়ে তিনি স্মরণ করিয়ে দেন, ২০১৬ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া জাতির সামনে একটি সংস্কার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। পরে বিএনপি ৩১ দফা সংস্কার পরিকল্পনা ঘোষণা করে। সেই ধারাবাহিকতার অংশ হিসেবেই জুলাই সনদ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
উত্তরাঞ্চলের উন্নয়ন নিয়েও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেন। বগুড়া বিমানবন্দরে কার্গো বিমান চলাচল চালুর পরিকল্পনার কথা জানান, যাতে কৃষিপণ্য সহজে বিদেশে রপ্তানি করা যায়। পাশাপাশি বগুড়ায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন এবং সেখানে কৃষিসহ বিভিন্ন বিষয়ে নতুন বিভাগ চালুর প্রতিশ্রুতি দেন।
এদিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী আরও কয়েকটি উন্নয়নমূলক কাজের উদ্বোধন করেন। এর মধ্যে ছিল বগুড়া প্রেসক্লাবের নতুন ভবন, বাইতুর রহমতান সেন্ট্রাল জামে মসজিদের পুনর্নির্মাণ কাজ, বগুড়া বার সমিতির বহুতল ভবন এবং সাত জেলায় ই-বেলবন্ড কার্যক্রম চালু। এছাড়া বগুড়া পৌরসভাকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত করার ঘোষণা দেন, যা স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
পটভূমি হিসেবে উল্লেখযোগ্য যে, বগুড়া জেলা দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান–এর স্মৃতিবিজড়িত এলাকা হিসেবে পরিচিত। ফলে রাজনৈতিকভাবে এই অঞ্চলে দলের কর্মসূচি ও জনসভাগুলো সাধারণত বড় আকারে অনুষ্ঠিত হয় এবং জাতীয় রাজনীতিতেও এর প্রতিফলন দেখা যায়।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাম্প্রতিক সময়ে প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে দেশের রাজনীতিতে আলোচনা বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সব মিলিয়ে বগুড়ার জনসভা থেকে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, প্রশাসনিক সংস্কার, কৃষি ও অবকাঠামো উন্নয়ন—এসব বিষয়ে একাধিক প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী। এখন এসব ঘোষণার বাস্তব অগ্রগতি কীভাবে হয়, সেটিই আগামী দিনে রাজনৈতিক ও জনমতের বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠবে।

আপনার মতামত লিখুন