সরকারি খাস জমি দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এবার কড়া অবস্থানের ঘোষণা এসেছে। দখলদার যত শক্তিশালীই হোক, খাস জমি উদ্ধারে কোনো আপস করা হবে না—এমন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী। প্রশাসনিক মহলে এ ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকায় জেলাপ্রশাসক সম্মেলনে বার্তা
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত জেলাপ্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ বহুদিনের। এসব জমি চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে পুনরুদ্ধারে সরকার কাজ শুরু করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—যেই দখল করে থাকুক, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ সময় তিনি জানান, খাস জমি উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ভূমি মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে দ্রুত নিষ্পত্তির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাস জমি দখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ জমা পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নানা জটিলতা তৈরি হয়।
ভূমিমন্ত্রী বলেন, অতীতে যেসব জমি অবৈধভাবে দখল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ে জরিপ কার্যক্রম চলছে। জেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একজন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “খাস জমি উদ্ধারের কাজ সহজ নয়। অনেক সময় স্থানীয়ভাবে চাপ থাকে, তবে কেন্দ্র থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে কাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়।”
সম্মেলনে ভূমিমন্ত্রী ভূমি অফিসগুলোর সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি।
তার মতে, সাধারণ মানুষ যেন সরাসরি সরকারি সেবা পেতে পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে, ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হন।
একজন ভুক্তভোগী নাগরিক জানান, “একটা নামজারি করতে গেলেও বারবার ঘুরতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য হতে হয়।” তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভূমি প্রতিমন্ত্রী সম্মেলনে জানান, ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অ্যাপ, হটলাইন এবং অনলাইন সেবা চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা এখন ঘরে বসেই অনেক সেবা নিতে পারছেন। তবে এই সুবিধাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।”
স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই এখনও এসব ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে অবগত নন। ফলে প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাস জমি উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ঘোষণা অনেকবারই হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কতটা কাজ হয় সেটা দেখার বিষয়।” অন্যদিকে আরেকজন জানান, “যদি সত্যিই প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খাস জমি উদ্ধার কার্যক্রম সফল হলে সরকারের রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। একই সঙ্গে ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনেও এ জমিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভূমি সংক্রান্ত মামলা, স্থানীয় প্রভাব, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
একজন নীতি বিশ্লেষক বলেন, “কঠোর বার্তা দেওয়া ভালো, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগই আসল পরীক্ষা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাস জমি উদ্ধারে সফল হতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি:
এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাস জমি উদ্ধার নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে সত্যিই ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণার বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
সরকারি খাস জমি দখল নিয়ে দীর্ঘদিনের অভিযোগের প্রেক্ষাপটে এবার কড়া অবস্থানের ঘোষণা এসেছে। দখলদার যত শক্তিশালীই হোক, খাস জমি উদ্ধারে কোনো আপস করা হবে না—এমন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন ভূমিমন্ত্রী। প্রশাসনিক মহলে এ ঘোষণা নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ঢাকায় জেলাপ্রশাসক সম্মেলনে বার্তা
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত জেলাপ্রশাসক (ডিসি) সম্মেলনে ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি খাস জমি অবৈধভাবে দখলের অভিযোগ বহুদিনের। এসব জমি চিহ্নিত করে পর্যায়ক্রমে পুনরুদ্ধারে সরকার কাজ শুরু করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, “আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়—যেই দখল করে থাকুক, ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এ সময় তিনি জানান, খাস জমি উদ্ধার কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করতে ভূমি মন্ত্রণালয় ও আইন মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে ভূমি-সংক্রান্ত মামলার দীর্ঘসূত্রিতা কমাতে দ্রুত নিষ্পত্তির দিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সরকারি সূত্রে জানা গেছে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে খাস জমি দখল নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ জমা পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ উঠলেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে নানা জটিলতা তৈরি হয়।
ভূমিমন্ত্রী বলেন, অতীতে যেসব জমি অবৈধভাবে দখল হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করতে মাঠপর্যায়ে জরিপ কার্যক্রম চলছে। জেলা প্রশাসনকে এ বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একজন জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “খাস জমি উদ্ধারের কাজ সহজ নয়। অনেক সময় স্থানীয়ভাবে চাপ থাকে, তবে কেন্দ্র থেকে স্পষ্ট নির্দেশনা থাকলে কাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ হয়।”
সম্মেলনে ভূমিমন্ত্রী ভূমি অফিসগুলোর সেবা ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনার বিষয়েও গুরুত্ব দেন। বিশেষ করে দালালচক্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা জানান তিনি।
তার মতে, সাধারণ মানুষ যেন সরাসরি সরকারি সেবা পেতে পারে, সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে, ভূমি অফিসে সেবা নিতে গিয়ে সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হন।
একজন ভুক্তভোগী নাগরিক জানান, “একটা নামজারি করতে গেলেও বারবার ঘুরতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে দালালের মাধ্যমে কাজ করাতে বাধ্য হতে হয়।” তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
ভূমি প্রতিমন্ত্রী সম্মেলনে জানান, ভূমি ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সেবা সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন অ্যাপ, হটলাইন এবং অনলাইন সেবা চালু করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে নাগরিকরা এখন ঘরে বসেই অনেক সেবা নিতে পারছেন। তবে এই সুবিধাগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি।”
স্থানীয় পর্যায়ে অনেকেই এখনও এসব ডিজিটাল সেবা সম্পর্কে অবগত নন। ফলে প্রত্যাশিত সুফল পুরোপুরি পাওয়া যাচ্ছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাস জমি উদ্ধার কার্যক্রম নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। কেউ কেউ সরকারের এ উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করছেন।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, “ঘোষণা অনেকবারই হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কতটা কাজ হয় সেটা দেখার বিষয়।” অন্যদিকে আরেকজন জানান, “যদি সত্যিই প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হবে।”
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, খাস জমি উদ্ধার কার্যক্রম সফল হলে সরকারের রাজস্ব বাড়ার পাশাপাশি ভূমি ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরতে পারে। একই সঙ্গে ভূমিহীন মানুষের পুনর্বাসনেও এ জমিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে চ্যালেঞ্জও কম নয়। ভূমি সংক্রান্ত মামলা, স্থানীয় প্রভাব, প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন কঠিন হতে পারে।
একজন নীতি বিশ্লেষক বলেন, “কঠোর বার্তা দেওয়া ভালো, কিন্তু মাঠপর্যায়ে এর বাস্তব প্রয়োগই আসল পরীক্ষা। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে পারলে পরিবর্তন সম্ভব।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাস জমি উদ্ধারে সফল হতে হলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি:
এছাড়া স্থানীয় প্রশাসনকে আরও শক্তিশালী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
খাস জমি উদ্ধার নিয়ে সরকারের কঠোর অবস্থান নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে এ উদ্যোগ কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করছে বাস্তবায়নের ওপর। প্রভাবশালী দখলদারদের বিরুদ্ধে সত্যিই ব্যবস্থা নেওয়া গেলে ভূমি ব্যবস্থাপনায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে। এখন দেখার বিষয়, ঘোষণার বাইরে গিয়ে মাঠপর্যায়ে কতটা কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

আপনার মতামত লিখুন