ইন্ট্রো:
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় এলাকায় আগাম বন্যার চাপ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সিলেট বিভাগের পাঁচ জেলায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বোরো ধান ও সবজি চাষে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা দিন দিন বাড়ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় বড় ধরনের বৃষ্টিপাত না হলেও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে হাওড় অঞ্চলের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার—এই পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল এখনো প্লাবিত রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, হাওড় বেসিনের অন্তত নয়টি নদীর ১১টি পয়েন্টে পানি প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের মোট ৪৬টি পানি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৩৫টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের পানিপ্রবাহ এবং স্থানীয়ভাবে ছিটেফোঁটা বৃষ্টিপাত মিলিয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিমাপ অনুযায়ী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানির উচ্চতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করছে। সুনামগঞ্জের মারকুলি এবং জগন্নাথপুর এলাকাতেও একই নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে।
নেত্রকোনায় ধনু-বাউলাই ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভোগাই-কংস ও মগরা নদীর পানিও একাধিক পয়েন্টে বিপজ্জনক অবস্থানে রয়েছে।
হবিগঞ্জে কালনি ও সুতাং নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করেছে। অন্যদিকে মৌলভীবাজারে মনু নদীর পানি একদিনেই এক মিটার বেশি বেড়ে বিপৎসীমা ছুঁয়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকায় পানি ধীরগতিতে বাড়লেও তা দীর্ঘস্থায়ী প্লাবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, আগাম বন্যায় অনেক কৃষকের বোরো ধান ইতোমধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কৃষকরা কোমর পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
একজন কৃষক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন,
“ধান পাকতে শুরু করেছে, কিন্তু হঠাৎ পানি বাড়ায় সব নষ্ট হওয়ার ভয়। কেটে আনলেও শুকানোর জায়গা নেই, রোদও পাচ্ছি না।”
অনেক জায়গায় কাটা ধান ভিজে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। খোলা জায়গা না থাকায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ফসল সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে শ্রমিক সংকট। স্থানীয়রা জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
একাধিক কৃষক দাবি করেছেন, হঠাৎ করে সবাই একসাথে ধান কাটতে নামায় শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে অনেক জমিতে ধান পেকে থাকলেও কাটার সুযোগ মিলছে না।
অন্যদিকে জমি পানিতে ডুবে থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার বা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সময়মতো ফসল ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আগাম বন্যা হাওড় অঞ্চলের কৃষির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন বাসিন্দা বলেন,
“প্রতি বছরই কিছু না কিছু ক্ষতি হয়, কিন্তু এবার সময়ের আগেই পানি আসায় ক্ষতি বেশি হচ্ছে। দ্রুত পানি নামানোর ব্যবস্থা না হলে পুরো মৌসুমটাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন, অস্থায়ী শুকানোর ব্যবস্থা এবং কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু কৃষকদের নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
হাওড় অঞ্চল দেশের বোরো ধানের একটি বড় উৎস। এখানকার উৎপাদন কমে গেলে চালের বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি বাড়লে তাদের ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে হবিগঞ্জে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
এছাড়া সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা নতুন করে প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে—
এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাওড় অঞ্চলের এই আগাম বন্যা আবারও প্রমাণ করছে, জলবায়ু ও উজানের পানির ওপর নির্ভরশীল এই এলাকার কৃষি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শুধু কৃষকরাই নয়, এর প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপরও। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।
বিষয় : হাওড় বন্যা বোরো ধান ক্ষতি কৃষক সংকট

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
ইন্ট্রো:
উত্তর-পূর্বাঞ্চলের হাওড় এলাকায় আগাম বন্যার চাপ কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। সিলেট বিভাগের পাঁচ জেলায় বিস্তীর্ণ নিম্নাঞ্চল এখনো পানির নিচে, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বোরো ধান ও সবজি চাষে। নদ-নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ায় কৃষকদের দুশ্চিন্তা দিন দিন বাড়ছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় বড় ধরনের বৃষ্টিপাত না হলেও উজান থেকে নেমে আসা পানির কারণে হাওড় অঞ্চলের পরিস্থিতি স্থিতিশীল হয়নি। সিলেট, সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার—এই পাঁচ জেলার নিম্নাঞ্চল এখনো প্লাবিত রয়েছে।
বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, হাওড় বেসিনের অন্তত নয়টি নদীর ১১টি পয়েন্টে পানি প্রাক-মৌসুমি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। দেশের মোট ৪৬টি পানি পর্যবেক্ষণ স্টেশনের মধ্যে ৩৫টিতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে, যা সামগ্রিকভাবে পরিস্থিতির অবনতির ইঙ্গিত দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উজানের পানিপ্রবাহ এবং স্থানীয়ভাবে ছিটেফোঁটা বৃষ্টিপাত মিলিয়ে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে বন্যা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক পরিমাপ অনুযায়ী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে পানির উচ্চতা উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জে কুশিয়ারা নদীর পানি বিপৎসীমার ওপরে অবস্থান করছে। সুনামগঞ্জের মারকুলি এবং জগন্নাথপুর এলাকাতেও একই নদীর পানি বিপৎসীমা ছাড়িয়ে গেছে।
নেত্রকোনায় ধনু-বাউলাই ও সোমেশ্বরী নদীর পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। ভোগাই-কংস ও মগরা নদীর পানিও একাধিক পয়েন্টে বিপজ্জনক অবস্থানে রয়েছে।
হবিগঞ্জে কালনি ও সুতাং নদীর পানি বেড়ে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত করেছে। অন্যদিকে মৌলভীবাজারে মনু নদীর পানি একদিনেই এক মিটার বেশি বেড়ে বিপৎসীমা ছুঁয়েছে।
সুনামগঞ্জের হাওড় এলাকায় পানি ধীরগতিতে বাড়লেও তা দীর্ঘস্থায়ী প্লাবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা গেছে, আগাম বন্যায় অনেক কৃষকের বোরো ধান ইতোমধ্যেই পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও কোথাও কৃষকরা কোমর পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন।
একজন কৃষক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন,
“ধান পাকতে শুরু করেছে, কিন্তু হঠাৎ পানি বাড়ায় সব নষ্ট হওয়ার ভয়। কেটে আনলেও শুকানোর জায়গা নেই, রোদও পাচ্ছি না।”
অনেক জায়গায় কাটা ধান ভিজে নষ্ট হওয়ার উপক্রম হয়েছে। খোলা জায়গা না থাকায় এবং আবহাওয়া অনুকূলে না থাকায় ফসল সংরক্ষণ কঠিন হয়ে পড়েছে।
পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে শ্রমিক সংকট। স্থানীয়রা জানান, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ মজুরি দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না।
একাধিক কৃষক দাবি করেছেন, হঠাৎ করে সবাই একসাথে ধান কাটতে নামায় শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে গেছে। ফলে অনেক জমিতে ধান পেকে থাকলেও কাটার সুযোগ মিলছে না।
অন্যদিকে জমি পানিতে ডুবে থাকায় কম্বাইন হারভেস্টার বা আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করা সম্ভব হচ্ছে না। এতে সময়মতো ফসল ঘরে তোলা কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, আগাম বন্যা হাওড় অঞ্চলের কৃষির জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
একজন বাসিন্দা বলেন,
“প্রতি বছরই কিছু না কিছু ক্ষতি হয়, কিন্তু এবার সময়ের আগেই পানি আসায় ক্ষতি বেশি হচ্ছে। দ্রুত পানি নামানোর ব্যবস্থা না হলে পুরো মৌসুমটাই নষ্ট হয়ে যাবে।”
তারা দ্রুত পানি নিষ্কাশন, অস্থায়ী শুকানোর ব্যবস্থা এবং কৃষকদের জন্য জরুরি সহায়তার দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বন্যা পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তা শুধু কৃষকদের নয়, দেশের সামগ্রিক খাদ্য উৎপাদনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
হাওড় অঞ্চল দেশের বোরো ধানের একটি বড় উৎস। এখানকার উৎপাদন কমে গেলে চালের বাজারে চাপ তৈরি হতে পারে।
এছাড়া কৃষকদের আর্থিক ক্ষতি বাড়লে তাদের ঋণ পরিশোধ এবং পরবর্তী মৌসুমে চাষাবাদও ঝুঁকির মুখে পড়বে।
বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী তিন দিনের মধ্যে হবিগঞ্জে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে। তবে নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জের কিছু এলাকায় পরিস্থিতি আরও কয়েকদিন অপরিবর্তিত থাকতে পারে।
এছাড়া সিলেট ও সুনামগঞ্জে সুরমা-কুশিয়ারা নদীর পানি আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, যা নতুন করে প্লাবনের ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
স্থানীয় কৃষি সংশ্লিষ্টরা দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছেন। তাদের মতে—
এসব উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা জরুরি।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
হাওড় অঞ্চলের এই আগাম বন্যা আবারও প্রমাণ করছে, জলবায়ু ও উজানের পানির ওপর নির্ভরশীল এই এলাকার কৃষি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ। সময়মতো কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে শুধু কৃষকরাই নয়, এর প্রভাব পড়বে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনীতির ওপরও। এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে ক্ষতি কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব।

আপনার মতামত লিখুন