ইন্ট্রো
অল্প সময়ে বেশি লাভের লোভ—এই পুরনো ফাঁদেই আবারও পা দিলেন বহু মানুষ। অ্যাগ্রো প্রজেক্টে বিনিয়োগের নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঘটনাটি নতুন করে বিনিয়োগ প্রতারণা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অ্যাগ্রো ব্যবসার আড়ালে পরিচালিত একটি কথিত বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় মো. ওবায়েদুল্লাহ (৩৩) নামে এক ব্যক্তিকে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য হিসেবে তিনি এই কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, “নাজরান ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো প্রজেক্ট” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হতো। প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত লোভনীয়—মাত্র ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে মাসে ৩ হাজার টাকা লাভ এবং ৩৩ মাসে মূলধন দ্বিগুণ।
এমন অফারে অনেকেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ২০২৩ সালের মে মাসে এক ভুক্তভোগী এবং তার তিন পরিচিত ব্যক্তি ঢাকার ভাটারা এলাকার একটি অফিসে গিয়ে প্রথম বিনিয়োগ করেন। প্রথম পর্যায়ে তারা কয়েক লাখ টাকা জমা দেন।
প্রাথমিকভাবে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, প্রথমে ছোট অঙ্কের লাভ দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। পরে একই বছরের জুলাই মাসে ব্যাংকের মাধ্যমে আরও বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে রাজি করানো হয়।
পরবর্তীতে “প্লট কেনার সুযোগ” দেখিয়ে বাড়তি অর্থ নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে একাধিক ধাপে মোট প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি অংশ ফেরত দেওয়া হলেও পরে হঠাৎ করেই অফিস বন্ধ হয়ে যায় এবং সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে যান।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির একাধিক ব্যাংক হিসাব ও সার্ভার বিশ্লেষণে আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তির ব্যক্তিগত ১৪টি ব্যাংক হিসাবেও প্রায় আড়াই কোটি টাকার লেনদেন শনাক্ত করা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এই তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৫ হাজার ভুক্তভোগী একত্রিত হয়ে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তারা প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন।
এক ভুক্তভোগী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন—
“প্রথমে মনে হয়েছিল সত্যিই ভালো একটা প্রজেক্ট। কিছু টাকা ফেরত পাওয়ার পর আমরা আরও বিনিয়োগ করি। পরে দেখি অফিসই বন্ধ, কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই।”
আরেকজন জানান,
“আমরা আমাদের সঞ্চয়, এমনকি ধার করে টাকা দিয়েছি। এখন সেই টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো উপায় দেখছি না।”
মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তরা আত্মগোপনে চলে যায় বলে জানা গেছে। তারা ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ রাখে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
তবে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে।
সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।
চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বিশেষ করে “অ্যাগ্রো”, “রিয়েল এস্টেট” বা “অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট” নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে,
—এসবই প্রতারণার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
একজন সাবেক আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তা বলেন,
“শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অর্থ কোথায় গেছে, কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়—সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অল্প সময়ে বেশি লাভের লোভ অনেক সময় বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়—এই ঘটনাটি তারই আরেকটি উদাহরণ। বিনিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং সরকারি অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থাও এই ধরনের প্রতারণা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

বুধবার, ০৬ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
ইন্ট্রো
অল্প সময়ে বেশি লাভের লোভ—এই পুরনো ফাঁদেই আবারও পা দিলেন বহু মানুষ। অ্যাগ্রো প্রজেক্টে বিনিয়োগের নামে শত শত কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করেছে অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ঘটনাটি নতুন করে বিনিয়োগ প্রতারণা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
অ্যাগ্রো ব্যবসার আড়ালে পরিচালিত একটি কথিত বিনিয়োগ প্রকল্পের মাধ্যমে বিপুল অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় মো. ওবায়েদুল্লাহ (৩৩) নামে এক ব্যক্তিকে রাজধানীর সবুজবাগ এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, একটি সংঘবদ্ধ চক্রের সদস্য হিসেবে তিনি এই কার্যক্রমে জড়িত ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, “নাজরান ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাগ্রো প্রজেক্ট” নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হতো। প্রস্তাব ছিল অত্যন্ত লোভনীয়—মাত্র ১ লাখ টাকা বিনিয়োগ করলে মাসে ৩ হাজার টাকা লাভ এবং ৩৩ মাসে মূলধন দ্বিগুণ।
এমন অফারে অনেকেই আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ২০২৩ সালের মে মাসে এক ভুক্তভোগী এবং তার তিন পরিচিত ব্যক্তি ঢাকার ভাটারা এলাকার একটি অফিসে গিয়ে প্রথম বিনিয়োগ করেন। প্রথম পর্যায়ে তারা কয়েক লাখ টাকা জমা দেন।
প্রাথমিকভাবে কিছু অর্থ ফেরত দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে বড় অঙ্কের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হয়।
ভুক্তভোগীদের দাবি অনুযায়ী, প্রথমে ছোট অঙ্কের লাভ দিয়ে বিশ্বাস তৈরি করা হয়। পরে একই বছরের জুলাই মাসে ব্যাংকের মাধ্যমে আরও বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগে রাজি করানো হয়।
পরবর্তীতে “প্লট কেনার সুযোগ” দেখিয়ে বাড়তি অর্থ নেওয়া হয়। এক পর্যায়ে একাধিক ধাপে মোট প্রায় ১ কোটি ৬৩ লাখ ৯৮ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে একটি অংশ ফেরত দেওয়া হলেও পরে হঠাৎ করেই অফিস বন্ধ হয়ে যায় এবং সংশ্লিষ্টরা আত্মগোপনে চলে যান।
সিআইডির প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির একাধিক ব্যাংক হিসাব ও সার্ভার বিশ্লেষণে আনুমানিক ৪০০ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এছাড়া গ্রেপ্তার ব্যক্তির ব্যক্তিগত ১৪টি ব্যাংক হিসাবেও প্রায় আড়াই কোটি টাকার লেনদেন শনাক্ত করা হয়েছে বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এই তথ্যগুলো যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে।
এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে প্রায় ১৫ হাজার ভুক্তভোগী একত্রিত হয়ে মানববন্ধন ও সংবাদ সম্মেলন করেন। সেখানে তারা প্রায় ৮০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ তোলেন।
এক ভুক্তভোগী, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন—
“প্রথমে মনে হয়েছিল সত্যিই ভালো একটা প্রজেক্ট। কিছু টাকা ফেরত পাওয়ার পর আমরা আরও বিনিয়োগ করি। পরে দেখি অফিসই বন্ধ, কারও সঙ্গে যোগাযোগ নেই।”
আরেকজন জানান,
“আমরা আমাদের সঞ্চয়, এমনকি ধার করে টাকা দিয়েছি। এখন সেই টাকা ফেরত পাওয়ার কোনো উপায় দেখছি না।”
মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তরা আত্মগোপনে চলে যায় বলে জানা গেছে। তারা ব্যবহৃত মোবাইল নম্বর বন্ধ রাখে এবং যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়।
তবে গোয়েন্দা তথ্য ও প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তাদের অবস্থান শনাক্ত করা হয়। এরপর অভিযান চালিয়ে গ্রেপ্তার করা হয় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে।
সিআইডি জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তির বিরুদ্ধে দেশের বিভিন্ন থানায় প্রতারণার অভিযোগে একাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় আদালত থেকে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি করা হয়েছে।
চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলে জানিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তারা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত লাভের প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার প্রবণতা সাম্প্রতিক সময়ে বেড়েছে। বিশেষ করে “অ্যাগ্রো”, “রিয়েল এস্টেট” বা “অনলাইন ইনভেস্টমেন্ট” নাম ব্যবহার করে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে,
—এসবই প্রতারণার গুরুত্বপূর্ণ লক্ষণ।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি—
একজন সাবেক আইনপ্রয়োগকারী কর্মকর্তা বলেন,
“শুধু গ্রেপ্তার করলেই হবে না। অর্থ কোথায় গেছে, কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়—সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।”
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অন্য সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। তবে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অল্প সময়ে বেশি লাভের লোভ অনেক সময় বড় ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়—এই ঘটনাটি তারই আরেকটি উদাহরণ। বিনিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই এবং সরকারি অনুমোদন নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর নজরদারি এবং দ্রুত বিচার ব্যবস্থাও এই ধরনের প্রতারণা রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন