দেশের অর্থনীতি যখন নানা চাপে টালমাটাল, ঠিক সেই সময়ই ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা থাকলেও এই বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা।
জ্বালানি সংকট, ডলারের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বেশ কঠিন সময় পার করছে। কৃষকরা ডিজেলের অভাবে সেচ দিতে পারছেন না, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ঘাটতিতে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এমন অবস্থায় কয়েক হাজার কোটি টাকার উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা অনেকের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।
সরকারি সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। এই চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে থাকবে আটটি ড্রিমলাইনার ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ।
এই কেনাকাটার বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০ বছরে কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার ও ডলারের দামের ওঠানামার কারণে এই ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। তাদের আশঙ্কা, বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার মতো চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, দেশে প্রবৃদ্ধির হার কমছে, বিনিয়োগ স্থবির এবং দারিদ্র্য বাড়ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের নতুন ঋণ নেওয়া অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই চুক্তির পেছনে কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশলও কাজ করছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক এড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ও কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়টিও এই আলোচনার অংশ।
তবে সমালোচকদের মতে, এই ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের বাস্তব প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি ছিল। বিশেষ করে যখন সরকার নিজেই ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছে, তখন এমন বড় প্রকল্প অনেকটাই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন তারা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বর্তমান বহরে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে কিছু লিজ নেওয়া, যেগুলো ধীরে ধীরে ফেরত দিতে হবে। সরকার বলছে, ভবিষ্যতে যাত্রী সংখ্যা বাড়বে, তাই বহর বড় করা দরকার। ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৪৭টি উড়োজাহাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, বড় উড়োজাহাজের চেয়ে ছোট ও মাঝারি রুটের জন্য উপযোগী বিমানই বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশের বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক রুটই স্বল্প বা মধ্যম দূরত্বের। তাই ড্রিমলাইনারের মতো বড় বিমানের অপারেশন খরচ বেশি হওয়ায় তা সবসময় লাভজনক নাও হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমিও রয়েছে। এর আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ধাপে ধাপে নতুন উড়োজাহাজ কিনে বহর আধুনিক করেছে। ২০০০ সালের পর থেকে পুরনো বহর বদলে নতুন বোয়িং যুক্ত করার ফলে সেবার মান কিছুটা উন্নত হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো পুরোপুরি লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি।
আরেকটি বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে এভিয়েশন খাত অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। বড় এয়ারলাইনসগুলো লাভ করতে হলে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সঠিক রুট পরিকল্পনা এবং খরচ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র নতুন উড়োজাহাজ কিনলেই লাভ বাড়ে না—এটা বহু দেশের অভিজ্ঞতা থেকেই জানা।
বিমান কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, সব কিছু যাচাই-বাছাই করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা দাবি করছে, আগের কেনা উড়োজাহাজের ঋণও ধীরে ধীরে পরিশোধ করা হচ্ছে এবং নতুন কেনাকাটার দায়ভারও বিমান নিজেই বহন করবে, সরকার শুধু গ্যারান্টি দেবে।
সব মিলিয়ে, এই উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা একদিকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হলেও, অন্যদিকে তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় ঝুঁকি বলেই মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এখন দেখার বিষয়, সরকার কীভাবে এই ব্যয়ের ভার সামলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে এবং এই বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনে।

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
দেশের অর্থনীতি যখন নানা চাপে টালমাটাল, ঠিক সেই সময়ই ১৪টি নতুন উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। কৃচ্ছ্রসাধনের ঘোষণা থাকলেও এই বড় ব্যয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা ও সমালোচনা।
জ্বালানি সংকট, ডলারের চাপ, উচ্চ মূল্যস্ফীতি—সব মিলিয়ে দেশের অর্থনীতি এখন বেশ কঠিন সময় পার করছে। কৃষকরা ডিজেলের অভাবে সেচ দিতে পারছেন না, বিদ্যুৎ ও গ্যাস ঘাটতিতে শিল্প উৎপাদনও ব্যাহত হচ্ছে। এমন অবস্থায় কয়েক হাজার কোটি টাকার উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা অনেকের কাছেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হচ্ছে।
সরকারি সূত্র বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের বোয়িং কোম্পানি থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার প্রক্রিয়া প্রায় চূড়ান্ত। এই চুক্তির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে থাকবে আটটি ড্রিমলাইনার ৭৮৭-১০, দুটি ৭৮৭-৯ এবং চারটি ৭৩৭-৮ ম্যাক্স মডেলের উড়োজাহাজ।
এই কেনাকাটার বড় অংশই ঋণের মাধ্যমে পরিশোধ করা হবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০ বছরে কিস্তিতে এই অর্থ পরিশোধের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, সুদের হার ও ডলারের দামের ওঠানামার কারণে এই ব্যয় আরও বেড়ে যেতে পারে। তাদের আশঙ্কা, বছরে প্রায় ২,৫০০ কোটি টাকার মতো চাপ তৈরি হতে পারে।
এদিকে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থাগুলোর প্রতিবেদনও খুব আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, দেশে প্রবৃদ্ধির হার কমছে, বিনিয়োগ স্থবির এবং দারিদ্র্য বাড়ছে। একই সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভেও চাপ রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের নতুন ঋণ নেওয়া অর্থনীতির জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
এই চুক্তির পেছনে কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক কৌশলও কাজ করছে বলে জানা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো এবং সম্ভাব্য উচ্চ শুল্ক এড়াতে এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা ইঙ্গিত দিয়েছেন। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে জ্বালানি ও কৃষিপণ্য আমদানির বিষয়টিও এই আলোচনার অংশ।
তবে সমালোচকদের মতে, এই ধরনের বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের বাস্তব প্রয়োজন ও সক্ষমতা বিবেচনা করা জরুরি ছিল। বিশেষ করে যখন সরকার নিজেই ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়েছে, তখন এমন বড় প্রকল্প অনেকটাই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন তারা।
বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বর্তমান বহরে রয়েছে ২১টি উড়োজাহাজ। এর মধ্যে কিছু লিজ নেওয়া, যেগুলো ধীরে ধীরে ফেরত দিতে হবে। সরকার বলছে, ভবিষ্যতে যাত্রী সংখ্যা বাড়বে, তাই বহর বড় করা দরকার। ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রায় ৪৭টি উড়োজাহাজের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞদের একটি অংশ বলছেন, বড় উড়োজাহাজের চেয়ে ছোট ও মাঝারি রুটের জন্য উপযোগী বিমানই বেশি প্রয়োজন। বাংলাদেশের বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক রুটই স্বল্প বা মধ্যম দূরত্বের। তাই ড্রিমলাইনারের মতো বড় বিমানের অপারেশন খরচ বেশি হওয়ায় তা সবসময় লাভজনক নাও হতে পারে।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পটভূমিও রয়েছে। এর আগে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ধাপে ধাপে নতুন উড়োজাহাজ কিনে বহর আধুনিক করেছে। ২০০০ সালের পর থেকে পুরনো বহর বদলে নতুন বোয়িং যুক্ত করার ফলে সেবার মান কিছুটা উন্নত হয়। তবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো পুরোপুরি লাভজনক হয়ে উঠতে পারেনি।
আরেকটি বিষয় হলো, বিশ্বজুড়ে এভিয়েশন খাত অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক। বড় এয়ারলাইনসগুলো লাভ করতে হলে দক্ষ ব্যবস্থাপনা, সঠিক রুট পরিকল্পনা এবং খরচ নিয়ন্ত্রণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধুমাত্র নতুন উড়োজাহাজ কিনলেই লাভ বাড়ে না—এটা বহু দেশের অভিজ্ঞতা থেকেই জানা।
বিমান কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, সব কিছু যাচাই-বাছাই করেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তারা দাবি করছে, আগের কেনা উড়োজাহাজের ঋণও ধীরে ধীরে পরিশোধ করা হচ্ছে এবং নতুন কেনাকাটার দায়ভারও বিমান নিজেই বহন করবে, সরকার শুধু গ্যারান্টি দেবে।
সব মিলিয়ে, এই উড়োজাহাজ কেনার পরিকল্পনা একদিকে ভবিষ্যতের বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হলেও, অন্যদিকে তা বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি বড় ঝুঁকি বলেই মনে করছেন অনেক বিশেষজ্ঞ। এখন দেখার বিষয়, সরকার কীভাবে এই ব্যয়ের ভার সামলে অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে এবং এই বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত দেশের জন্য কতটা সুফল বয়ে আনে।

আপনার মতামত লিখুন