দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬

ঋণের বোঝা বাড়িয়ে বোয়িং কেনা—কৌশল নাকি ঝুঁকি?

ঋণের বোঝা বাড়িয়ে বোয়িং কেনা—কৌশল নাকি ঝুঁকি?

রায় হয়েছে, বিচার হয়নি—সাত খুন মামলায় স্বজনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা

ডিনারের আগে ‘গুলি ছোড়া হবে’—মন্তব্যের পরই ওয়াশিংটনে সত্যিকারের গুলির আতঙ্ক

চট্টগ্রাম বন্দরে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আসছে ৫ মে, সচল হবে ইস্টার্ন রিফাইনারি

“জনগণের সেবক হতে হবে”—প্রশাসনের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর বার্তা

হরমুজ প্রণালিতে রাশিয়ার জন্য টোল মওকুফ: ইরানের নতুন কৌশল

দেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব, টিকা সংকটে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা

লোডশেডিং কমার আশা কবে? বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রীর আশ্বাসে স্বস্তির ইঙ্গিত

রায় হয়েছে, বিচার হয়নি—সাত খুন মামলায় স্বজনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা

রায় হয়েছে, বিচার হয়নি—সাত খুন মামলায় স্বজনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা
-ছবি: সংগৃহীত

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার রায় ঘোষণার প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। দীর্ঘ এই বিলম্বে ক্ষোভ আর হতাশা বাড়ছে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে। তারা বলছেন, এত বড় একটি ঘটনার পরও যদি বিচার সম্পন্ন না হয়, তাহলে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহরণ করা হয় সাতজনকে। এদের মধ্যে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার এবং আরও পাঁচজন। অপহরণের তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় তাদের মরদেহ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে।

তদন্তে জানা যায়, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। মামলায় মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়, যাদের মধ্যে ২৫ জন ছিলেন র‌্যাবের সদস্য। এমন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। মামলার পর অভিযুক্তদের সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় ঘোষণা করে। এতে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। ২০১৮ সালের আগস্টে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং বাকিদের সাজা কমিয়ে দেয়।

এরপর মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যায়। বর্তমানে এটি ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে আটকে আছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, এই পর্যায়ে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক হলেও এই মামলায় সময়টা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়ে গেছে। তারা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।

এই দীর্ঘসূত্রতায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন নিহতদের পরিবার। গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম নিহত হওয়ার এক মাস পর জন্ম নেয় তার মেয়ে রোজা আক্তার জান্নাত। বাবাকে না দেখেই বড় হচ্ছে সে। তার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, মেয়েটি অন্যদের বাবাকে দেখে কষ্ট পায়, কান্না করে। যারা তার বাবাকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের শাস্তি কবে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।

নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটিও একইভাবে হতাশ। তিনি বলেন, এত বড় একটি ঘটনা দেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এত বছর পরও বিচার শেষ হয়নি। বিভিন্ন সরকারের সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাটি ঝুলে আছে। তিনি আশা করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

নিহত তাজুল ইসলামের বৃদ্ধ বাবা আবুল খায়ের বলেন, জীবদ্দশায় তিনি এই মামলার শেষ দেখে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েই সন্দেহ আছে। তার মতো অনেক স্বজনই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশা হারিয়ে ফেলছেন।

পটভূমি হিসেবে বলা যায়, নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্যের দ্বন্দ্বের কারণে আলোচনায় থাকে। শিল্পাঞ্চল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের লড়াইও নতুন নয়। সাত খুনের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বাংলাদেশের একটি বিশেষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যা সন্ত্রাস ও গুরুতর অপরাধ দমনে কাজ করে। কিন্তু এই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় তখন ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল এবং জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

সব মিলিয়ে, সাত খুন মামলাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়—এটি দেশের বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত বছর পরও যখন এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—ন্যায়বিচার কি সত্যিই সময়মতো পাওয়া সম্ভব? এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের প্রতীক্ষার শেষ দেখতে পায় কি না।

বিষয় : বিচার হয়নি সাত খুন মামলায়

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬


রায় হয়েছে, বিচার হয়নি—সাত খুন মামলায় স্বজনদের দীর্ঘ প্রতীক্ষা

প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬

featured Image

নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার রায় ঘোষণার প্রায় নয় বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো তা কার্যকর হয়নি। দীর্ঘ এই বিলম্বে ক্ষোভ আর হতাশা বাড়ছে নিহতদের স্বজনদের মধ্যে। তারা বলছেন, এত বড় একটি ঘটনার পরও যদি বিচার সম্পন্ন না হয়, তাহলে ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোড থেকে অপহরণ করা হয় সাতজনকে। এদের মধ্যে ছিলেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকার এবং আরও পাঁচজন। অপহরণের তিন দিন পর শীতলক্ষ্যা নদী থেকে একে একে উদ্ধার করা হয় তাদের মরদেহ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ সৃষ্টি হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠে।

তদন্তে জানা যায়, স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। মামলায় মোট ৩৫ জনকে আসামি করা হয়, যাদের মধ্যে ২৫ জন ছিলেন র‌্যাবের সদস্য। এমন ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের সম্পৃক্ততা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। মামলার পর অভিযুক্তদের সবাইকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

২০১৭ সালের ১৬ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালত রায় ঘোষণা করে। এতে সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেনসহ ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। পরে আসামিরা উচ্চ আদালতে আপিল করেন। ২০১৮ সালের আগস্টে হাইকোর্ট ১৫ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে এবং বাকিদের সাজা কমিয়ে দেয়।

এরপর মামলাটি সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে যায়। বর্তমানে এটি ‘লিভ টু আপিল’ পর্যায়ে আটকে আছে। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীরা বলছেন, এই পর্যায়ে কিছুটা সময় লাগা স্বাভাবিক হলেও এই মামলায় সময়টা অস্বাভাবিকভাবে বেশি হয়ে গেছে। তারা দ্রুত নিষ্পত্তির চেষ্টা করছেন বলে জানিয়েছেন।

এই দীর্ঘসূত্রতায় সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন নিহতদের পরিবার। গাড়িচালক জাহাঙ্গীর আলম নিহত হওয়ার এক মাস পর জন্ম নেয় তার মেয়ে রোজা আক্তার জান্নাত। বাবাকে না দেখেই বড় হচ্ছে সে। তার মা শামসুন্নাহার আক্তার নুপুর কষ্ট করে সংসার চালাচ্ছেন। তিনি বলেন, মেয়েটি অন্যদের বাবাকে দেখে কষ্ট পায়, কান্না করে। যারা তার বাবাকে কেড়ে নিয়েছে, তাদের শাস্তি কবে হবে—এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছে নেই।

নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা আক্তার বিউটিও একইভাবে হতাশ। তিনি বলেন, এত বড় একটি ঘটনা দেশের মানুষকে নাড়িয়ে দিয়েছিল, কিন্তু এত বছর পরও বিচার শেষ হয়নি। বিভিন্ন সরকারের সময় পেরিয়ে গেলেও মামলাটি ঝুলে আছে। তিনি আশা করছেন, বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।

নিহত তাজুল ইসলামের বৃদ্ধ বাবা আবুল খায়ের বলেন, জীবদ্দশায় তিনি এই মামলার শেষ দেখে যেতে পারবেন কি না, তা নিয়েই সন্দেহ আছে। তার মতো অনেক স্বজনই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আশা হারিয়ে ফেলছেন।

পটভূমি হিসেবে বলা যায়, নারায়ণগঞ্জ দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক আধিপত্যের দ্বন্দ্বের কারণে আলোচনায় থাকে। শিল্পাঞ্চল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এখানে বিভিন্ন গোষ্ঠীর প্রভাব বিস্তারের লড়াইও নতুন নয়। সাত খুনের ঘটনাটি সেই বাস্তবতারই একটি ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে ওঠে।

অন্যদিকে, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বাংলাদেশের একটি বিশেষ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, যা সন্ত্রাস ও গুরুতর অপরাধ দমনে কাজ করে। কিন্তু এই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগ ওঠায় তখন ব্যাপক সমালোচনা তৈরি হয়েছিল এবং জবাবদিহিতা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।

সব মিলিয়ে, সাত খুন মামলাটি শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়—এটি দেশের বিচারব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এত বছর পরও যখন এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি, তখন স্বাভাবিকভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগে—ন্যায়বিচার কি সত্যিই সময়মতো পাওয়া সম্ভব? এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কত দ্রুত এই মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারে এবং ভুক্তভোগী পরিবারগুলো তাদের প্রতীক্ষার শেষ দেখতে পায় কি না।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর