রাজধানীতে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটি বেডে দুই থেকে তিনজন শিশু নিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। এতে যেমন হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাও।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের হামের ওয়ার্ডে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে। হাসপাতালের ৪র্থ তলার ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে ঢুকলেই চোখে পড়ে একেকটি বেডে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে ছোট ছোট শিশুরা। তাদের পাশে বসে উদ্বিগ্ন মুখে পাহারা দিচ্ছেন বাবা-মায়েরা।
ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করা সিনিয়র নার্স শান্তনা জানান, বর্তমানে হাসপাতালে হামের জন্য দুটি ওয়ার্ড চালু রয়েছে—৪২১ ও ৪২৪ নম্বর। ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে মোট ৬০টি বেড থাকলেও গত ২৬ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত সেখানে ৯৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। পরে কিছু রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৫-এ। তবুও বেডের তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে রোগীর চাপ আরও বেড়ে যায়। নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে, ফলে জায়গা সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে, ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ডেও একই অবস্থা। সেখানে ৩০টি বেডের বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছে ৪২ জন শিশু। এই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা নার্স আশা রানী জানান, গত রাত ২টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ১৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। অনেক শিশুই শুধু হামে নয়, সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও উচ্চ জ্বর নিয়ে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি বলেন, “বেড কম থাকায় আমাদের এক বিছানায় দুই থেকে তিনজন করে রাখতে হচ্ছে। এতে শিশুদের কষ্ট যেমন বাড়ছে, তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের সঙ্গে অন্যান্য জটিলতা যুক্ত হওয়ায় রোগীদের সুস্থ হতে সময় লাগছে বেশি। ফলে দ্রুত বেড খালি করা যাচ্ছে না, আর নতুন রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি সাধারণত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে এবং দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বাংলাদেশে Expanded Programme on Immunization (EPI) এর আওতায় হামের টিকা দেওয়া হলেও অনেক এলাকায় এখনো শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে মৌসুমভিত্তিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
এছাড়া, আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে গরমের সময় ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের সঙ্গে হাম যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
অভিভাবকদের অনেকেই অভিযোগ করছেন, হাসপাতালে জায়গা সংকটের কারণে তারা স্বস্তিতে সন্তানদের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। তবুও বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে এখানেই থাকতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রাজধানীর এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য বিভাগ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সবাই।

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
রাজধানীতে হামের প্রকোপ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, একটি বেডে দুই থেকে তিনজন শিশু নিয়ে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে চিকিৎসকদের। এতে যেমন হাসপাতালের ওপর চাপ বাড়ছে, তেমনি বাড়ছে অভিভাবকদের দুশ্চিন্তাও।
রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের হামের ওয়ার্ডে গিয়ে এমন চিত্রই দেখা গেছে। হাসপাতালের ৪র্থ তলার ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে ঢুকলেই চোখে পড়ে একেকটি বেডে গাদাগাদি করে শুয়ে আছে ছোট ছোট শিশুরা। তাদের পাশে বসে উদ্বিগ্ন মুখে পাহারা দিচ্ছেন বাবা-মায়েরা।
ওয়ার্ডে দায়িত্ব পালন করা সিনিয়র নার্স শান্তনা জানান, বর্তমানে হাসপাতালে হামের জন্য দুটি ওয়ার্ড চালু রয়েছে—৪২১ ও ৪২৪ নম্বর। ৪২১ নম্বর ওয়ার্ডে মোট ৬০টি বেড থাকলেও গত ২৬ এপ্রিল দুপুর পর্যন্ত সেখানে ৯৫ জন শিশু চিকিৎসাধীন ছিল। পরে কিছু রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৭৫-এ। তবুও বেডের তুলনায় রোগীর সংখ্যা অনেক বেশি।
তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন বিকেল ও সন্ধ্যার দিকে রোগীর চাপ আরও বেড়ে যায়। নতুন নতুন শিশু ভর্তি হচ্ছে, ফলে জায়গা সংকট আরও তীব্র হচ্ছে।
অন্যদিকে, ৪২৪ নম্বর ওয়ার্ডেও একই অবস্থা। সেখানে ৩০টি বেডের বিপরীতে চিকিৎসা নিচ্ছে ৪২ জন শিশু। এই ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা নার্স আশা রানী জানান, গত রাত ২টা থেকে দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ১৪ জন নতুন রোগী ভর্তি হয়েছে। অনেক শিশুই শুধু হামে নয়, সঙ্গে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও উচ্চ জ্বর নিয়ে আসছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
তিনি বলেন, “বেড কম থাকায় আমাদের এক বিছানায় দুই থেকে তিনজন করে রাখতে হচ্ছে। এতে শিশুদের কষ্ট যেমন বাড়ছে, তেমনি চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাও কঠিন হয়ে যাচ্ছে।”
চিকিৎসকরা বলছেন, হামের সঙ্গে অন্যান্য জটিলতা যুক্ত হওয়ায় রোগীদের সুস্থ হতে সময় লাগছে বেশি। ফলে দ্রুত বেড খালি করা যাচ্ছে না, আর নতুন রোগীদের জায়গা দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।
স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। এটি সাধারণত শিশুদের বেশি আক্রান্ত করে এবং দ্রুত একজন থেকে আরেকজনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। টিকা নিলে এই রোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব হলেও অনেক ক্ষেত্রে টিকার আওতার বাইরে থাকা শিশুরা বেশি ঝুঁকিতে থাকে।
বাংলাদেশে Expanded Programme on Immunization (EPI) এর আওতায় হামের টিকা দেওয়া হলেও অনেক এলাকায় এখনো শতভাগ কভারেজ নিশ্চিত করা যায়নি। ফলে মৌসুমভিত্তিক সময়ে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়।
এছাড়া, আবহাওয়া পরিবর্তনের সময় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়ে, যা সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে গরমের সময় ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগের সঙ্গে হাম যুক্ত হলে পরিস্থিতি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
অভিভাবকদের অনেকেই অভিযোগ করছেন, হাসপাতালে জায়গা সংকটের কারণে তারা স্বস্তিতে সন্তানদের চিকিৎসা করাতে পারছেন না। তবুও বিকল্প না থাকায় বাধ্য হয়ে এখানেই থাকতে হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, রাজধানীর এই পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যের জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত টিকাদান কার্যক্রম জোরদার করা, সচেতনতা বাড়ানো এবং হাসপাতালের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে স্বাস্থ্য বিভাগ কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছে সবাই।

আপনার মতামত লিখুন