নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় একই পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সোমবার গভীর রাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
পুলিশ জানায়, নিহতরা হলেন—হাবিবুর রহমান (৩২), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), তাদের ছেলে পারভেজ (৯) এবং মেয়ে সাদিয়া আক্তার (৩)। চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পরপরই সন্দেহভাজন হিসেবে চারজনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে হাবিবুর রহমানের বাবার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হাবিবুরের মরদেহ ঘরের ভেতর বিছানায় পড়ে আছে। তার ছেলে ও মেয়ের লাশ পাওয়া যায় পাশের একটি কক্ষে, আর বাড়ির আঙিনায় পড়ে ছিল তার স্ত্রীর মরদেহ। এমন নির্মম দৃশ্য দেখে এলাকার মানুষ স্তব্ধ হয়ে পড়েন।
সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, বাড়ির দরজা-জানালা অক্ষত ছিল। কোথাও ভাঙচুরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা পরিবারের পরিচিত কেউ হতে পারে। কারণ, অপরিচিত কেউ হলে জোর করে প্রবেশের কিছু না কিছু চিহ্ন থাকার কথা।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিন (৭০), তার দুই বোন ডালিমা বেগম (৪৫) ও শিরিনা বেগম (৪০), এবং ভাগনে সবুজ রানাকে (২৫) পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। যদিও পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে অভিযুক্ত করেনি, তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমিজমা নিয়ে পরিবারটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, নমির উদ্দিন তার মেয়েদের প্রত্যেককে ১০ কাঠা করে জমি দিয়ে বাকি সম্পত্তি ছেলে হাবিবুর রহমানের নামে লিখে দেন। এ নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে মনোমালিন্য তৈরি হয়, যা সময়ের সঙ্গে তীব্র আকার ধারণ করে।
নিহতের স্বজনদের আরও দাবি, ঈদের আগে একবার খাবারের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে তাদের অচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই ঘটনার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শামীম আহমেদ এবং নওগাঁর পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম। তাদের সঙ্গে র্যাব, সিআইডি ও পিবিআইয়ের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি ডাকাতির ঘটনা নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্য কোনো কারণেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক বিরোধ বা জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব থেকে সহিংস ঘটনার নজির নতুন নয়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ মাঝে মাঝে বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়। তবে একই পরিবারের চারজনকে এভাবে হত্যা করার ঘটনা খুবই বিরল এবং ভয়াবহ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে র্যাব, সিআইডি ও পিবিআই সাধারণত জটিল ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতে তদন্ত সহায়তা করে থাকে। তাদের যৌথ তদন্তের মাধ্যমে অনেক সময় দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই ঘটনাতেও তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এদিকে, নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের আহাজারিতে পুরো গ্রাম ভারী হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, নিয়ামতপুরের এই হত্যাকাণ্ড এখনো রহস্যে ঘেরা। পারিবারিক বিরোধ, পূর্ব পরিকল্পনা নাকি অন্য কোনো কারণ—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা না গেলেও, দ্রুত সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে এলাকাবাসী ও নিহতদের পরিবার।

মঙ্গলবার, ২১ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ এপ্রিল ২০২৬
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলায় একই পরিবারের চার সদস্যকে গলা কেটে হত্যার ঘটনা স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আতঙ্ক ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। সোমবার গভীর রাতে উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের বাহাদুরপুর গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। সকালে বিষয়টি জানাজানি হলে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে আসে।
পুলিশ জানায়, নিহতরা হলেন—হাবিবুর রহমান (৩২), তার স্ত্রী পপি সুলতানা (২৫), তাদের ছেলে পারভেজ (৯) এবং মেয়ে সাদিয়া আক্তার (৩)। চারজনের মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য নওগাঁ জেনারেল হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ঘটনার পরপরই সন্দেহভাজন হিসেবে চারজনকে পুলিশ হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভোরের দিকে হাবিবুর রহমানের বাবার চিৎকারে প্রতিবেশীরা ছুটে এসে এই হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি জানতে পারেন। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, হাবিবুরের মরদেহ ঘরের ভেতর বিছানায় পড়ে আছে। তার ছেলে ও মেয়ের লাশ পাওয়া যায় পাশের একটি কক্ষে, আর বাড়ির আঙিনায় পড়ে ছিল তার স্ত্রীর মরদেহ। এমন নির্মম দৃশ্য দেখে এলাকার মানুষ স্তব্ধ হয়ে পড়েন।
সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, বাড়ির দরজা-জানালা অক্ষত ছিল। কোথাও ভাঙচুরের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। এতে ধারণা করা হচ্ছে, হত্যাকারীরা পরিবারের পরিচিত কেউ হতে পারে। কারণ, অপরিচিত কেউ হলে জোর করে প্রবেশের কিছু না কিছু চিহ্ন থাকার কথা।
এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিহত হাবিবুর রহমানের বাবা নমির উদ্দিন (৭০), তার দুই বোন ডালিমা বেগম (৪৫) ও শিরিনা বেগম (৪০), এবং ভাগনে সবুজ রানাকে (২৫) পুলিশ হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। যদিও পুলিশ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কাউকে অভিযুক্ত করেনি, তবে তদন্তের স্বার্থে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, জমিজমা নিয়ে পরিবারটির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। অভিযোগ রয়েছে, নমির উদ্দিন তার মেয়েদের প্রত্যেককে ১০ কাঠা করে জমি দিয়ে বাকি সম্পত্তি ছেলে হাবিবুর রহমানের নামে লিখে দেন। এ নিয়ে ভাই-বোনদের মধ্যে মনোমালিন্য তৈরি হয়, যা সময়ের সঙ্গে তীব্র আকার ধারণ করে।
নিহতের স্বজনদের আরও দাবি, ঈদের আগে একবার খাবারের সঙ্গে কিছু মিশিয়ে তাদের অচেতন করার চেষ্টা করা হয়েছিল। সেই ঘটনার সঙ্গে এই হত্যাকাণ্ডের কোনো যোগসূত্র থাকতে পারে বলেও সন্দেহ করা হচ্ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন রাজশাহী রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি শামীম আহমেদ এবং নওগাঁর পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম। তাদের সঙ্গে র্যাব, সিআইডি ও পিবিআইয়ের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা ঘটনাটিকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করার আশ্বাস দিয়েছেন।
পুলিশ সুপার তারিকুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি ডাকাতির ঘটনা নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। অন্য কোনো কারণেই হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত রহস্য উদঘাটনের চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশে গ্রামাঞ্চলে পারিবারিক বিরোধ বা জমিজমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব থেকে সহিংস ঘটনার নজির নতুন নয়। বিশেষ করে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় জমি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধ মাঝে মাঝে বড় ধরনের সংঘর্ষে রূপ নেয়। তবে একই পরিবারের চারজনকে এভাবে হত্যা করার ঘটনা খুবই বিরল এবং ভয়াবহ।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে র্যাব, সিআইডি ও পিবিআই সাধারণত জটিল ও চাঞ্চল্যকর মামলাগুলোতে তদন্ত সহায়তা করে থাকে। তাদের যৌথ তদন্তের মাধ্যমে অনেক সময় দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এই ঘটনাতেও তারা সক্রিয়ভাবে কাজ করছে।
এদিকে, নিহতদের স্বজন ও স্থানীয়রা দ্রুত তদন্ত শেষ করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। তাদের আহাজারিতে পুরো গ্রাম ভারী হয়ে উঠেছে।
সব মিলিয়ে, নিয়ামতপুরের এই হত্যাকাণ্ড এখনো রহস্যে ঘেরা। পারিবারিক বিরোধ, পূর্ব পরিকল্পনা নাকি অন্য কোনো কারণ—সব দিকই খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত নিশ্চিত করে কিছু বলা না গেলেও, দ্রুত সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে এলাকাবাসী ও নিহতদের পরিবার।

আপনার মতামত লিখুন