ঢাকার অভিজাত এলাকা বারিধারায় একটি গির্জায় ঢুকে ফাদারের হাত-পা ও মুখ বেঁধে নগদ অর্থ লুটের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গভীর রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বারিধারার একটি গির্জায় এই লুটের ঘটনা ঘটে। গির্জার দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা, পরে ফাদারকে জিম্মি করে নগদ আড়াই লাখ টাকা, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার রাতে দুই ব্যক্তি মুখে মাস্ক পরে গির্জার সীমানা প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা গির্জার স্টাফদের একটি কক্ষ বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়, যাতে কেউ বাধা দিতে না পারে। এরপর তারা গির্জার পরিচালক ফাদার সুবাস পুলক গমেজের কক্ষে ঢোকার জন্য জানালার গ্রিল কেটে ফেলে।
ভেতরে ঢুকে ফাদারের হাত-পা ও মুখ বেঁধে তাকে অচল করে রাখা হয়। এরপর কক্ষের আলমারি খুলে নগদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা, একটি পাসপোর্ট এবং একটি জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। পালানোর সময় তারা ব্যাটারিচালিত একটি রিকশা ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার পরপরই পুলিশের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে আসে।
পরে বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজ ও চালকদের তথ্য যাচাই করে এক চালককে শনাক্ত করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—আবুল হোসেন রতন (৩৬), মোহাম্মদ নিজাম (৩৭) এবং আক্তার হোসেন মনা (৩৮)। তাদের কাছ থেকে মোট প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, একটি পাসপোর্ট, একটি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং গ্রিল কাটার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং সোর্সের তথ্য ব্যবহার করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত এবং অর্থের প্রয়োজন মেটাতে এ ধরনের অপরাধে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার পরিকল্পনায় একজন রিকশাচালক বাইরে পাহারায় ছিল এবং অন্য দুজন ভেতরে ঢুকে লুটপাট চালায়। তারা ধারণা করেছিল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে গির্জায় নগদ অর্থ থাকতে পারে।”
ঘটনার পর বারিধারা এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন,
“এলাকাটি সাধারণত নিরাপদ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু এমন ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। রাতে নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।”
আরেকজন বলেন, “গির্জার মতো একটি ধর্মীয় স্থানে এমন ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এতে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ছোট-বড় চুরি, ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। এর পেছনে মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তুলনামূলক কম নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে থাকে, যা অপরাধীদের জন্য সহজ টার্গেটে পরিণত হতে পারে। তাই এসব স্থানে আধুনিক সিসিটিভি, নিরাপত্তারক্ষী এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা প্রয়োজন।
পুলিশ বলছে, নগরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া স্থানীয়দেরও সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগ যাচাই করে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্তদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বারিধারার গির্জায় এই লুটের ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনসাধারণের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার স্বস্তির বিষয় হলেও, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শনিবার, ০২ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
ঢাকার অভিজাত এলাকা বারিধারায় একটি গির্জায় ঢুকে ফাদারের হাত-পা ও মুখ বেঁধে নগদ অর্থ লুটের ঘটনা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। গভীর রাতে সংঘটিত এই ঘটনায় পুলিশ তিনজনকে গ্রেপ্তার করেছে বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
মঙ্গলবার দিবাগত রাতে বারিধারার একটি গির্জায় এই লুটের ঘটনা ঘটে। গির্জার দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশ করে দুর্বৃত্তরা, পরে ফাদারকে জিম্মি করে নগদ আড়াই লাখ টাকা, পাসপোর্ট ও জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ঘটনার রাতে দুই ব্যক্তি মুখে মাস্ক পরে গির্জার সীমানা প্রাচীর টপকে ভেতরে প্রবেশ করে। প্রথমে তারা গির্জার স্টাফদের একটি কক্ষ বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়, যাতে কেউ বাধা দিতে না পারে। এরপর তারা গির্জার পরিচালক ফাদার সুবাস পুলক গমেজের কক্ষে ঢোকার জন্য জানালার গ্রিল কেটে ফেলে।
ভেতরে ঢুকে ফাদারের হাত-পা ও মুখ বেঁধে তাকে অচল করে রাখা হয়। এরপর কক্ষের আলমারি খুলে নগদ প্রায় আড়াই লাখ টাকা, একটি পাসপোর্ট এবং একটি জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে তারা পালিয়ে যায়। পালানোর সময় তারা ব্যাটারিচালিত একটি রিকশা ব্যবহার করেছে বলে জানা গেছে।
ঘটনার পরপরই পুলিশের একাধিক ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে তদন্ত শুরু করে। আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করে বিশ্লেষণ করা হয়। এতে একটি ব্যাটারিচালিত রিকশার সন্দেহজনক গতিবিধি নজরে আসে।
পরে বিভিন্ন রিকশা গ্যারেজ ও চালকদের তথ্য যাচাই করে এক চালককে শনাক্ত করা হয়। তাকে গ্রেপ্তারের পর তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আরও দুইজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন—আবুল হোসেন রতন (৩৬), মোহাম্মদ নিজাম (৩৭) এবং আক্তার হোসেন মনা (৩৮)। তাদের কাছ থেকে মোট প্রায় ২ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, একটি পাসপোর্ট, একটি জাতীয় পরিচয়পত্র এবং গ্রিল কাটার সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ঢাকা মহানগর পুলিশের গুলশান বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং সোর্সের তথ্য ব্যবহার করে অভিযুক্তদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে, তারা মাদক ও অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত এবং অর্থের প্রয়োজন মেটাতে এ ধরনের অপরাধে জড়িত বলে দাবি করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, “ঘটনার পরিকল্পনায় একজন রিকশাচালক বাইরে পাহারায় ছিল এবং অন্য দুজন ভেতরে ঢুকে লুটপাট চালায়। তারা ধারণা করেছিল, ধর্মীয় অনুষ্ঠান শেষে গির্জায় নগদ অর্থ থাকতে পারে।”
ঘটনার পর বারিধারা এলাকায় নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা বলেন,
“এলাকাটি সাধারণত নিরাপদ হিসেবেই পরিচিত। কিন্তু এমন ঘটনা আমাদের ভাবিয়ে তুলছে। রাতে নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি।”
আরেকজন বলেন, “গির্জার মতো একটি ধর্মীয় স্থানে এমন ঘটনা খুবই দুঃখজনক। এতে মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক সময়ে ছোট-বড় চুরি, ছিনতাই ও দস্যুতার ঘটনা কিছুটা বেড়েছে। এর পেছনে মাদকাসক্তি ও অনলাইন জুয়ার প্রবণতা বড় কারণ হিসেবে উঠে আসছে।
আইনশৃঙ্খলা বিশ্লেষকরা বলছেন, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত তুলনামূলক কম নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে থাকে, যা অপরাধীদের জন্য সহজ টার্গেটে পরিণত হতে পারে। তাই এসব স্থানে আধুনিক সিসিটিভি, নিরাপত্তারক্ষী এবং নিয়মিত টহল জোরদার করা প্রয়োজন।
পুলিশ বলছে, নগরজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করতে তারা ইতোমধ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে। সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের ওপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা বাড়াতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এছাড়া স্থানীয়দেরও সচেতন থাকার আহ্বান জানানো হয়েছে। কোনো সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখলে দ্রুত পুলিশকে জানানোর জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে। তবে এসব অভিযোগ যাচাই করে আইনি প্রক্রিয়া অনুযায়ী পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযুক্তদের বিষয়ে বিস্তারিত জানতে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বারিধারার গির্জায় এই লুটের ঘটনা শুধু একটি অপরাধ নয়, বরং শহরের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ওপর নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানসহ জনসাধারণের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এই ঘটনার দ্রুত তদন্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার স্বস্তির বিষয় হলেও, ভবিষ্যতে এমন ঘটনা এড়াতে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা পরিকল্পনা গ্রহণ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন