জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও জামায়াত রাজনীতি নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যে বিরোধী দলীয় সদস্যদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যা পরে হট্টগোলে রূপ নেয়।
মঙ্গলবার বিকেলে সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে ফজলুর রহমান এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ বা শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত ইসলামী করতে পারেন না। যদি কেউ করেন, তাহলে তা তার জন্য “দ্বিগুণ অপরাধ” বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যের পরপরই সংসদে উত্তেজনা তৈরি হয়।
ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে আরও বলেন, “আমি আবারও বলছি, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না। শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না। যদি কেউ করে থাকে, তাহলে তিনি দ্বিগুণ অপরাধ করছেন।” তিনি মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতির বিরোধিতা তুলে ধরেন।
তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সাম্প্রতিক কোনো আন্দোলনকে তুলনা করা হলে তা মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করে দেখা হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, এমন তুলনা তাকে কষ্ট দেয় এবং তিনি মনে মনে ভাবেন, “হয়তো আমি মরে গেলেই ভালো হতো।”
ফজলুর রহমান বিরোধী দলীয় নেতারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতা, যিনি তার চেয়ে বয়সে ছোট, নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান এবং শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে দাবি করেন—এ বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার এই বক্তব্য সংসদে আরও উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধী দলীয় সদস্যরা প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। তারা হট্টগোল শুরু করলে সংসদের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন এবং সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
পরবর্তীতে বিরোধী দলীয় নেতা ফ্লোর নিয়ে ফজলুর রহমানের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি স্পিকারের কাছে অনুরোধ করেন, ফজলুর রহমানের মন্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হোক। তিনি দাবি করেন, এসব বক্তব্য অসংসদীয় এবং সংসদের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত ইসলামী দলটি স্বাধীনতার সময়কার ভূমিকাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে রয়েছে।
এছাড়া সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে প্রায়ই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক দেখা যায়, যা কখনো কখনো হট্টগোলেও গড়ায়। তবে এসব পরিস্থিতিতে স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তিনিই সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বর্তমান রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যতেও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যখন বিষয়টি পরিবার বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, ফজলুর রহমানের মন্তব্য সংসদে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এতে বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধ ও তার মূল্যবোধ এখনো দেশের রাজনীতিতে একটি কেন্দ্রীয় এবং আবেগপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া সংসদের পরিবেশকে কতটা প্রভাবিত করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
বিষয় : সংসদে মুক্তিযোদ্ধা জামায়াত

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
জাতীয় সংসদে মুক্তিযোদ্ধা পরিবার ও জামায়াত রাজনীতি নিয়ে মন্তব্যকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের এক বক্তব্যে বিরোধী দলীয় সদস্যদের তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, যা পরে হট্টগোলে রূপ নেয়।
মঙ্গলবার বিকেলে সংসদের অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদ প্রস্তাবের আলোচনায় অংশ নিয়ে ফজলুর রহমান এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ বা শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত ইসলামী করতে পারেন না। যদি কেউ করেন, তাহলে তা তার জন্য “দ্বিগুণ অপরাধ” বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার এই বক্তব্যের পরপরই সংসদে উত্তেজনা তৈরি হয়।
ফজলুর রহমান তার বক্তব্যে আরও বলেন, “আমি আবারও বলছি, মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না। শহীদ পরিবারের কেউ জামায়াত করতে পারে না। যদি কেউ করে থাকে, তাহলে তিনি দ্বিগুণ অপরাধ করছেন।” তিনি মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধের সঙ্গে জামায়াতের রাজনীতির বিরোধিতা তুলে ধরেন।
তার বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে সাম্প্রতিক কোনো আন্দোলনকে তুলনা করা হলে তা মুক্তিযুদ্ধকে ছোট করে দেখা হয়। এই প্রসঙ্গে তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে বলেন, এমন তুলনা তাকে কষ্ট দেয় এবং তিনি মনে মনে ভাবেন, “হয়তো আমি মরে গেলেই ভালো হতো।”
ফজলুর রহমান বিরোধী দলীয় নেতারও সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, জামায়াতের একজন শীর্ষ নেতা, যিনি তার চেয়ে বয়সে ছোট, নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান এবং শহীদ পরিবারের সদস্য হিসেবে দাবি করেন—এ বিষয়টি তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তার এই বক্তব্য সংসদে আরও উত্তেজনা বাড়িয়ে দেয়।
ফজলুর রহমানের বক্তব্যের পর বিরোধী দলীয় সদস্যরা প্রতিবাদ জানাতে শুরু করেন। তারা হট্টগোল শুরু করলে সংসদের পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেন এবং সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান।
পরবর্তীতে বিরোধী দলীয় নেতা ফ্লোর নিয়ে ফজলুর রহমানের বক্তব্যের জবাব দেন। তিনি স্পিকারের কাছে অনুরোধ করেন, ফজলুর রহমানের মন্তব্য সংসদের কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হোক। তিনি দাবি করেন, এসব বক্তব্য অসংসদীয় এবং সংসদের মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে মুক্তিযুদ্ধ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির ভূমিকা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়েছে। বিশেষ করে জামায়াত ইসলামী দলটি স্বাধীনতার সময়কার ভূমিকাকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে সমালোচনার মুখে রয়েছে।
এছাড়া সংসদে উত্তপ্ত পরিস্থিতি তৈরি হওয়া নতুন কোনো ঘটনা নয়। গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যুতে প্রায়ই সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তর্ক-বিতর্ক দেখা যায়, যা কখনো কখনো হট্টগোলেও গড়ায়। তবে এসব পরিস্থিতিতে স্পিকারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ তিনিই সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষা করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও বর্তমান রাজনীতির সম্পর্ক নিয়ে এ ধরনের বক্তব্য ভবিষ্যতেও বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যখন বিষয়টি পরিবার বা ব্যক্তিগত পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়, তখন তা আরও সংবেদনশীল হয়ে ওঠে।
সব মিলিয়ে, ফজলুর রহমানের মন্তব্য সংসদে নতুন করে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে। এতে বোঝা যায়, মুক্তিযুদ্ধ ও তার মূল্যবোধ এখনো দেশের রাজনীতিতে একটি কেন্দ্রীয় এবং আবেগপূর্ণ ইস্যু হিসেবে রয়ে গেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের মন্তব্য ও প্রতিক্রিয়া সংসদের পরিবেশকে কতটা প্রভাবিত করে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।

আপনার মতামত লিখুন