আসন্ন বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় জলাবদ্ধতা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বর্ষার সময় যাতে পানি জমে না থাকে এবং ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ ছড়াতে না পারে, সে লক্ষ্যেই এই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে প্রাক-বর্ষা এবং বর্ষা—দুই সময়ের জন্য আলাদা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে কিউলেক্স ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং মানুষকে সচেতন করতে নানা কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
উত্তর সিটিতে প্রতিদিন সকালে লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে এবং সন্ধ্যায় ফগিং করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে খাল-বিল ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। বিশেষ করে প্রায় ছয় হাজার বিঘা জলাশয়, যেগুলো কচুরিপানায় ভরে ছিল, সেগুলো পরিষ্কার করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
এছাড়া “শনিবারের অঙ্গীকার, নিজ নিজ বাসা-বাড়ি করি পরিষ্কার” এই স্লোগান সামনে রেখে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডগুলোতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। “অপারেশন ক্লিন হোম” নামে আরেকটি কর্মসূচির মাধ্যমে বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে নতুনত্ব আনতে জৈব কীটনাশক বিটিআই ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের পর এখন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি ব্যবহৃত কীটনাশকের মান ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনও আলাদা করে কাজ করছে। সেখানে প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কর্মকর্তাদের একটি মনিটরিং টিম নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো খুঁজে বের করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
দক্ষিণ সিটিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও পানি জমে থাকলে বা মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হলে জরিমানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্ট, জিয়া সরণি এবং কাজলা খাল পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। এসব জায়গা দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকার জন্য পরিচিত ছিল। এখন সেগুলো সংস্কার ও পরিষ্কারের মাধ্যমে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, দক্ষিণ সিটি ইতোমধ্যে ছয়টি পোর্টেবল পাম্প কিনেছে, যা জরুরি সময়ে পানি সরাতে কাজে লাগবে। বর্তমানে তিনটি আউটলেট দিয়ে পানি বের করা হচ্ছে এবং আরও একটি নতুন আউটলেট তৈরির কাজ চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বড় ড্রেন বা আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়ন হবে। পাশাপাশি আরও কতগুলো আউটলেট দরকার, তা নির্ধারণ করতে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ঢাকার অনেক এলাকায় পানি জমে দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। এতে যানজট, দুর্ভোগ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয়, যা ডেঙ্গুর প্রধান বাহক। গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে, ফলে বিষয়টি এখন বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার পানি জমে থাকা জায়গা কমানো এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো। সরকার যে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে, তাতে এই দুই দিকই গুরুত্ব পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, খাল-ড্রেন পরিষ্কার, আধুনিক কীটনাশক ব্যবহার, জনগণের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সরকার। পরিকল্পনাগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আসন্ন বর্ষায় ঢাকাবাসীর ভোগান্তি অনেকটাই কমবে এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে—এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।
বিষয় : জলাবদ্ধতা ডেঙ্গু পরিকল্পনায়

সোমবার, ২৭ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৭ এপ্রিল ২০২৬
আসন্ন বর্ষা মৌসুম সামনে রেখে রাজধানী ঢাকায় জলাবদ্ধতা ও মশাবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের কর্মপরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে নগরবাসীর দীর্ঘদিনের ভোগান্তি অনেকটাই কমবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।
সোমবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ তথ্য জানান। সংসদ সদস্য মো. আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, বর্ষার সময় যাতে পানি জমে না থাকে এবং ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো রোগ ছড়াতে না পারে, সে লক্ষ্যেই এই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মন্ত্রী জানান, ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন ইতোমধ্যে প্রাক-বর্ষা এবং বর্ষা—দুই সময়ের জন্য আলাদা পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। বিশেষ করে কিউলেক্স ও এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং মানুষকে সচেতন করতে নানা কর্মসূচি চালানো হচ্ছে।
উত্তর সিটিতে প্রতিদিন সকালে লার্ভা ধ্বংসে লার্ভিসাইড ছিটানো হচ্ছে এবং সন্ধ্যায় ফগিং করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে খাল-বিল ও ড্রেন পরিষ্কারের কাজ চলছে। বিশেষ করে প্রায় ছয় হাজার বিঘা জলাশয়, যেগুলো কচুরিপানায় ভরে ছিল, সেগুলো পরিষ্কার করার কাজ চলছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রী।
এছাড়া “শনিবারের অঙ্গীকার, নিজ নিজ বাসা-বাড়ি করি পরিষ্কার” এই স্লোগান সামনে রেখে নির্দিষ্ট ওয়ার্ডগুলোতে পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালানো হচ্ছে। “অপারেশন ক্লিন হোম” নামে আরেকটি কর্মসূচির মাধ্যমে বাসাবাড়ির আশপাশ পরিষ্কার রাখার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
মশা নিয়ন্ত্রণে নতুনত্ব আনতে জৈব কীটনাশক বিটিআই ব্যবহারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি পরীক্ষামূলকভাবে প্রয়োগের পর এখন কেনার প্রক্রিয়া চলছে। পাশাপাশি ব্যবহৃত কীটনাশকের মান ঠিক আছে কি না, তা যাচাই করতে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান কাজ করছে।
অন্যদিকে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনও আলাদা করে কাজ করছে। সেখানে প্রতি সপ্তাহে প্রতিটি এলাকায় স্থানীয় জনগণকে যুক্ত করে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও মশা নিধন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। কর্মকর্তাদের একটি মনিটরিং টিম নিয়মিত ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলো খুঁজে বের করে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে।
দক্ষিণ সিটিতে এডিস মশার বংশবিস্তার ঠেকাতে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে। কোথাও পানি জমে থাকলে বা মশার প্রজননের সুযোগ তৈরি হলে জরিমানা করা হচ্ছে। পাশাপাশি লিফলেট বিতরণ ও মাইকিং করে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে সেগুনবাগিচা বক্স কালভার্ট, জিয়া সরণি এবং কাজলা খাল পরিষ্কারের কাজ শুরু হয়েছে। এসব জায়গা দীর্ঘদিন ধরে পানি জমে থাকার জন্য পরিচিত ছিল। এখন সেগুলো সংস্কার ও পরিষ্কারের মাধ্যমে পানি দ্রুত নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
মন্ত্রী জানান, দক্ষিণ সিটি ইতোমধ্যে ছয়টি পোর্টেবল পাম্প কিনেছে, যা জরুরি সময়ে পানি সরাতে কাজে লাগবে। বর্তমানে তিনটি আউটলেট দিয়ে পানি বের করা হচ্ছে এবং আরও একটি নতুন আউটলেট তৈরির কাজ চলছে।
দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে গুলিস্তান থেকে সদরঘাট পর্যন্ত একটি বড় ড্রেন বা আউটলেট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যা বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়ন হবে। পাশাপাশি আরও কতগুলো আউটলেট দরকার, তা নির্ধারণ করতে বিশেষজ্ঞদের দিয়ে সমীক্ষা চালানো হচ্ছে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, প্রতি বছর বর্ষা মৌসুমে ঢাকার অনেক এলাকায় পানি জমে দীর্ঘ সময় ধরে থাকে। এতে যানজট, দুর্ভোগ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে জমে থাকা পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয়, যা ডেঙ্গুর প্রধান বাহক। গত কয়েক বছর ধরে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা বেড়েছে, ফলে বিষয়টি এখন বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু ওষুধ ছিটিয়ে মশা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার পানি জমে থাকা জায়গা কমানো এবং মানুষের সচেতনতা বাড়ানো। সরকার যে সমন্বিত পরিকল্পনা নিয়েছে, তাতে এই দুই দিকই গুরুত্ব পেয়েছে।
সব মিলিয়ে, খাল-ড্রেন পরিষ্কার, আধুনিক কীটনাশক ব্যবহার, জনগণের অংশগ্রহণ এবং দীর্ঘমেয়াদি অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে একটি সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে সরকার। পরিকল্পনাগুলো ঠিকভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আসন্ন বর্ষায় ঢাকাবাসীর ভোগান্তি অনেকটাই কমবে এবং ডেঙ্গুর ঝুঁকিও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে—এমনটাই আশা সংশ্লিষ্টদের।

আপনার মতামত লিখুন