নওগাঁর পোরশা উপজেলায় উদ্ধার হওয়া ১৩৭ কেজি ওজনের একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি অবশেষে গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে হস্তান্তর করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পোরশা থানা পুলিশ অভিযান চালায়। উপজেলার ১ নম্বর নিতপুর ইউনিয়নের শীতলী গ্রামে রহমত নামে এক ব্যক্তির বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে মাটির নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় এই মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার করা মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ৫৬ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ১৩৭ কেজি। বিশাল আকারের এই বিষ্ণুমূর্তিটি দেখতে বেশ প্রাচীন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের দিকনির্দেশনায় পুরো উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উদ্ধার হওয়ার পর আইন অনুযায়ী মূর্তিটি থানায় সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
বাংলাদেশের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, এ ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে রাখা যায় না। ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন (পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী এসব সম্পদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা স্বীকৃত জাদুঘরের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। এই আইনের কারণেই উদ্ধার হওয়া মূর্তিটি সরকারি তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।
এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এই মূর্তিটি নিয়ে গবেষণা করার আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা পুলিশ সুপারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানায় এবং শিক্ষামূলক গবেষণার জন্য মূর্তিটি চায়।
পরবর্তীতে ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে পোরশা থানা পুলিশ আদালতে আবেদন করে, যাতে মূর্তিটি জাদুঘরে হস্তান্তরের অনুমতি পাওয়া যায়। আদালত বিষয়টি বিবেচনা করে ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে মূর্তিটি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালকের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়।
আদালতের সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে ২১ এপ্রিল ২০২৬ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মূর্তিটি হস্তান্তর করা হয়। পোরশা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে এটি গ্রহণ করেন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. কাজি এম মোস্তাফিজুর রহমান।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয় এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের বহু প্রাচীন নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এই জাদুঘরে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্ঞানভাণ্ডার।
নওগাঁ জেলা ও আশপাশের অঞ্চল প্রাচীন ইতিহাসে সমৃদ্ধ। পাল ও সেন যুগে এই অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনেক নিদর্শন গড়ে উঠেছিল। ফলে এখানে মাঝে মাঝে মাটির নিচ থেকে বিভিন্ন প্রত্নসম্পদ পাওয়া যায়। এর আগেও এই এলাকায় কয়েকটি পুরনো মূর্তি ও স্থাপনার চিহ্ন উদ্ধার হয়েছে, যা গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উদ্ধার হওয়া এই বিষ্ণুমূর্তিটি সেই প্রাচীন ঐতিহ্যেরই একটি অংশ হতে পারে। এটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হলে এর প্রকৃত বয়স, নির্মাণশৈলী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
পোরশা থেকে উদ্ধার হওয়া এই বিষ্ণুমূর্তিটি শুধু একটি প্রত্নবস্তু নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান জ্ঞান হয়ে উঠবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বুধবার, ২২ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
নওগাঁর পোরশা উপজেলায় উদ্ধার হওয়া ১৩৭ কেজি ওজনের একটি প্রাচীন বিষ্ণুমূর্তি অবশেষে গবেষণা ও সংরক্ষণের জন্য জাদুঘরে পাঠানো হয়েছে। আদালতের নির্দেশে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি রাজশাহীর বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরে হস্তান্তর করেছে পুলিশ।
পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ রাত প্রায় সাড়ে ১০টার দিকে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পোরশা থানা পুলিশ অভিযান চালায়। উপজেলার ১ নম্বর নিতপুর ইউনিয়নের শীতলী গ্রামে রহমত নামে এক ব্যক্তির বাড়ির পাশের পারিবারিক কবরস্থানে মাটির নিচে পরিত্যক্ত অবস্থায় এই মূর্তিটি উদ্ধার করা হয়।
উদ্ধার করা মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় ৫৬ ইঞ্চি এবং ওজন প্রায় ১৩৭ কেজি। বিশাল আকারের এই বিষ্ণুমূর্তিটি দেখতে বেশ প্রাচীন বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রাথমিকভাবে এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নসম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলামের দিকনির্দেশনায় পুরো উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালিত হয়। উদ্ধার হওয়ার পর আইন অনুযায়ী মূর্তিটি থানায় সংরক্ষণ করা হয় এবং পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া শুরু করা হয়।
বাংলাদেশের পুরাকীর্তি সংরক্ষণ আইন অনুযায়ী, এ ধরনের প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে রাখা যায় না। ১৯৬৮ সালের পুরাকীর্তি আইন (পরবর্তীতে ১৯৭৬ সালে সংশোধিত) অনুযায়ী এসব সম্পদ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা স্বীকৃত জাদুঘরের কাছে হস্তান্তর করতে হয়। এই আইনের কারণেই উদ্ধার হওয়া মূর্তিটি সরকারি তত্ত্বাবধানে নেওয়া হয়।
এরই মধ্যে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর কর্তৃপক্ষ এই মূর্তিটি নিয়ে গবেষণা করার আগ্রহ প্রকাশ করে। তারা পুলিশ সুপারকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানায় এবং শিক্ষামূলক গবেষণার জন্য মূর্তিটি চায়।
পরবর্তীতে ১ মার্চ ২০২৬ তারিখে পোরশা থানা পুলিশ আদালতে আবেদন করে, যাতে মূর্তিটি জাদুঘরে হস্তান্তরের অনুমতি পাওয়া যায়। আদালত বিষয়টি বিবেচনা করে ১২ মার্চ ২০২৬ তারিখে মূর্তিটি বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের পরিচালকের কাছে হস্তান্তরের নির্দেশ দেয়।
আদালতের সেই নির্দেশনার ভিত্তিতে ২১ এপ্রিল ২০২৬ দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে মূর্তিটি হস্তান্তর করা হয়। পোরশা থানা পুলিশের পক্ষ থেকে এটি গ্রহণ করেন বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক ড. কাজি এম মোস্তাফিজুর রহমান।
বরেন্দ্র গবেষণা জাদুঘর বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন জাদুঘর হিসেবে পরিচিত। এটি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরিচালিত হয় এবং দেশের উত্তরাঞ্চলের বহু প্রাচীন নিদর্শন এখানে সংরক্ষিত রয়েছে। এই জাদুঘরে প্রত্নতত্ত্ব, ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করা হয়, যা শিক্ষার্থীদের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ একটি জ্ঞানভাণ্ডার।
নওগাঁ জেলা ও আশপাশের অঞ্চল প্রাচীন ইতিহাসে সমৃদ্ধ। পাল ও সেন যুগে এই অঞ্চলে হিন্দু ও বৌদ্ধ ধর্মের অনেক নিদর্শন গড়ে উঠেছিল। ফলে এখানে মাঝে মাঝে মাটির নিচ থেকে বিভিন্ন প্রত্নসম্পদ পাওয়া যায়। এর আগেও এই এলাকায় কয়েকটি পুরনো মূর্তি ও স্থাপনার চিহ্ন উদ্ধার হয়েছে, যা গবেষকদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, উদ্ধার হওয়া এই বিষ্ণুমূর্তিটি সেই প্রাচীন ঐতিহ্যেরই একটি অংশ হতে পারে। এটি নিয়ে বিস্তারিত গবেষণা হলে এর প্রকৃত বয়স, নির্মাণশৈলী এবং ঐতিহাসিক গুরুত্ব সম্পর্কে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে।
পোরশা থেকে উদ্ধার হওয়া এই বিষ্ণুমূর্তিটি শুধু একটি প্রত্নবস্তু নয়, বরং দেশের ইতিহাস ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। সঠিকভাবে সংরক্ষণ ও গবেষণার মাধ্যমে এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য মূল্যবান জ্ঞান হয়ে উঠবে—এমনটাই আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

আপনার মতামত লিখুন