বরিশালে থামছে না হাম আতঙ্ক, আরও ২ শিশুর মৃত্যু
বরিশালে হামের উপসর্গে শিশু মৃত্যুর মিছিল থামছে না। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও দুই শিশুর মৃত্যু নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে পুরো বিভাগজুড়ে। এতে চলতি বছরে এ রোগে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ জনে।
বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ৮টা থেকে মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় চিকিৎসাধীন অবস্থায় এই দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। বিষয়টি হাসপাতাল পরিচালকের দপ্তর থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও এখনো ঝুঁকি কাটেনি।
মারা যাওয়া দুই শিশুর একজন বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার চার মাস বয়সী হুজাইফা। অন্যজন বরগুনার তালতলী উপজেলার ১৩ মাস বয়সী আবদুল্লাহ। তারা দুজনই হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি ছিল এবং চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যায়। এত অল্প বয়সী শিশুদের মৃত্যু পরিবারগুলোর পাশাপাশি পুরো এলাকাতেই শোকের ছায়া ফেলেছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ৫৫ জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছেন। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৬৩ জনে। একই সময়ে ৩১ জন রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। তবে নতুন রোগীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় হাসপাতালের ওপর চাপ কমছে না।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত শুধু শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেই হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছেন ১ হাজার ২২ জন রোগী। আর পুরো বরিশাল বিভাগে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৪১৬ জনে। এত বড় সংখ্যক রোগী একসাথে হওয়ায় স্বাস্থ্যসেবায় চাপ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম মশিউল মুনীর জানিয়েছেন, মার্চ মাসে হামের প্রকোপ সবচেয়ে বেশি ছিল। বর্তমানে তা কিছুটা কমলেও পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। রোগীর চাপ এখনো অনেক বেশি থাকায় চিকিৎসকদের ওপরও বাড়তি চাপ পড়ছে।
অন্যদিকে বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. শ্যামল কৃষ্ণ মন্ডল বলেন, হামের চিকিৎসা ও প্রতিরোধে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় নজরদারি বাড়ানো হয়েছে এবং টিকার কোনো সংকট নেই। তিনি জানান, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচির পাশাপাশি বিশেষ ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে শিশুদের টিকা দেওয়া হচ্ছে। তারপরও আক্রান্তের সংখ্যা বেশি হওয়ায় পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ। সাধারণত শিশুদের মধ্যেই এটি বেশি দেখা যায়। জ্বর, সর্দি, চোখ লাল হওয়া এবং শরীরে লালচে ফুসকুড়ি—এসবই হামের সাধারণ লক্ষণ। সময়মতো চিকিৎসা না পেলে এটি নিউমোনিয়া বা ডায়রিয়ার মতো জটিলতায় রূপ নিতে পারে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
বাংলাদেশে জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে শিশুদের হাম প্রতিরোধে এমআর (Measles-Rubella) টিকা দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য বিভাগ বলছে, যেসব শিশু এই টিকা থেকে বাদ পড়ে, তারাই বেশি ঝুঁকিতে থাকে। তাই অভিভাবকদের সচেতন হওয়া খুবই জরুরি।
পটভূমি হিসেবে জানা যায়, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাঝেমধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও বরিশাল বিভাগে এবারের পরিস্থিতি তুলনামূলক বেশি গুরুতর। বিশেষ করে প্রত্যন্ত এলাকায় টিকাদানের ঘাটতি ও সচেতনতার অভাব এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে, বরিশালে হামের পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ নানা পদক্ষেপ নিচ্ছে, তবুও রোগীর চাপ এবং মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় টিকাদান জোরদার করা, দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।