নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় হঠাৎ বাড়তি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাজারো একর ধানক্ষেত। যেখানে কয়েকদিন আগেও পাকা ধানের সোনালি রঙে ভরে ছিল মাঠ, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানির ঢেউ। চোখের সামনে বছরের পরিশ্রম হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হওয়ায় তারা বেশ আশাবাদী ছিলেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে জমিতে চাষ করেছিলেন, কেউ আবার আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে। ফলে কাটা না হওয়া ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবন পুরোপুরি নির্ভর করে এই এক ফসলের ওপর। বছরের বেশিরভাগ সময় পানি থাকায় এখানে এক মৌসুমেই চাষাবাদ করা সম্ভব হয়। তাই এই ফসল নষ্ট হওয়া মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, পুরো বছরের জীবিকা সংকটে পড়ে যাওয়া। অনেক কৃষক জানান, তারা এখন সংসার চালানো নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন।
নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের মুখে হাসি নেই, বরং হতাশা আর কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। কেউ কেউ জমির পাশে দাঁড়িয়ে ডুবে যাওয়া ধানের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, এই ফসলই ছিল সন্তানদের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ আর পরিবারের ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা।
স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের তালিকা তৈরি করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, দ্রুত সহায়তা না পেলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
হাওর অঞ্চলে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢলের কারণে ফসলের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে ফসল কাটার ঠিক আগে পানি বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও পানি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছেন, যাতে এ ধরনের ক্ষতি কমানো যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে, যার প্রভাব হাওর অঞ্চলে আরও বেশি দেখা যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং উজানের পানির চাপ একসঙ্গে তৈরি হলে হাওরের মতো নিচু এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায়। ফলে ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে, অনেক কৃষক অভিযোগ করেছেন যে, কিছু স্থানে বাঁধ দুর্বল থাকায় বা সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় পানি সহজেই ঢুকে পড়েছে। তারা মনে করেন, আগে থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এই ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো যেত।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে অনেকে বিকল্প কাজের সন্ধান করছেন। কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ আবার ধারদেনা করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এভাবে টিকে থাকা কঠিন বলে মনে করছেন তারা।
সবকিছু মিলিয়ে, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের এই পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে কৃষকেরা কতটা অসহায়। দ্রুত ক্ষতিপূরণ, টেকসই অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এখন সবার দৃষ্টি প্রশাসনের দিকে, তারা কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে পারে।

মঙ্গলবার, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
নেত্রকোনার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় হঠাৎ বাড়তি বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে হাজারো একর ধানক্ষেত। যেখানে কয়েকদিন আগেও পাকা ধানের সোনালি রঙে ভরে ছিল মাঠ, সেখানে এখন শুধু পানি আর পানির ঢেউ। চোখের সামনে বছরের পরিশ্রম হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, চলতি মৌসুমে ধানের ফলন ভালো হওয়ায় তারা বেশ আশাবাদী ছিলেন। অনেকেই ঋণ নিয়ে জমিতে চাষ করেছিলেন, কেউ আবার আগের ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছিলেন। কিন্তু টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানির চাপে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়ে। ফলে কাটা না হওয়া ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের জীবন পুরোপুরি নির্ভর করে এই এক ফসলের ওপর। বছরের বেশিরভাগ সময় পানি থাকায় এখানে এক মৌসুমেই চাষাবাদ করা সম্ভব হয়। তাই এই ফসল নষ্ট হওয়া মানে শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি নয়, পুরো বছরের জীবিকা সংকটে পড়ে যাওয়া। অনেক কৃষক জানান, তারা এখন সংসার চালানো নিয়েই দুশ্চিন্তায় আছেন।
নেত্রকোনার বিভিন্ন হাওর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, কৃষকের মুখে হাসি নেই, বরং হতাশা আর কষ্টের ছাপ স্পষ্ট। কেউ কেউ জমির পাশে দাঁড়িয়ে ডুবে যাওয়া ধানের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তাদের অনেকেই বলছেন, এই ফসলই ছিল সন্তানদের পড়াশোনা, ঋণ পরিশোধ আর পরিবারের ভবিষ্যতের একমাত্র ভরসা।
স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে কাজ চলছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বিপুল পরিমাণ জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। কৃষকদের তালিকা তৈরি করে সরকারি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। তবে ক্ষতিগ্রস্তদের মতে, দ্রুত সহায়তা না পেলে তাদের পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
হাওর অঞ্চলে এমন পরিস্থিতি নতুন নয়। প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনোভাবে অকাল বন্যা বা পাহাড়ি ঢলের কারণে ফসলের ক্ষতি হয়। বিশেষ করে এপ্রিল-মে মাসে ফসল কাটার ঠিক আগে পানি বাড়লে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়। কৃষকেরা দীর্ঘদিন ধরে টেকসই বাঁধ নির্মাণ ও পানি নিয়ন্ত্রণের দাবি জানিয়ে আসছেন, যাতে এ ধরনের ক্ষতি কমানো যায়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৃষ্টির ধরন বদলে যাচ্ছে, যার প্রভাব হাওর অঞ্চলে আরও বেশি দেখা যাচ্ছে। অল্প সময়ের মধ্যে অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং উজানের পানির চাপ একসঙ্গে তৈরি হলে হাওরের মতো নিচু এলাকায় দ্রুত পানি জমে যায়। ফলে ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এদিকে, অনেক কৃষক অভিযোগ করেছেন যে, কিছু স্থানে বাঁধ দুর্বল থাকায় বা সময়মতো সংস্কার না হওয়ায় পানি সহজেই ঢুকে পড়েছে। তারা মনে করেন, আগে থেকেই কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এই ক্ষতির পরিমাণ অনেকটাই কমানো যেত।
বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মধ্যে অনেকে বিকল্প কাজের সন্ধান করছেন। কেউ দিনমজুরি করছেন, কেউ আবার ধারদেনা করে সংসার চালানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এভাবে টিকে থাকা কঠিন বলে মনে করছেন তারা।
সবকিছু মিলিয়ে, নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের এই পরিস্থিতি আবারও মনে করিয়ে দিল যে, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সামনে কৃষকেরা কতটা অসহায়। দ্রুত ক্ষতিপূরণ, টেকসই অবকাঠামো এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। এখন সবার দৃষ্টি প্রশাসনের দিকে, তারা কত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয় এবং ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে পারে।

আপনার মতামত লিখুন