দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

শেরপুর সীমান্তে বন ও পাহাড় রক্ষায় বিক্ষোভ: ‘বনখেকোদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা

উত্তরের সীমান্তঘেঁষা শেরপুরের পাহাড়ি জনপদে দিন দিন কমে যাচ্ছে সবুজের বিস্তার। একসময় ঘন বন, পাহাড়ি ঝিরি আর বন্যপ্রাণীর বিচরণে মুখর থাকা এলাকাগুলো এখন বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও অবৈধ দখলের অভিযোগে উদ্বেগের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশ রক্ষার দাবিতে সরব হয়েছেন স্থানীয় মানুষ, তরুণ সমাজ ও বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন।শেরপুরের ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্তবর্তী পাহাড়ি বনাঞ্চল রক্ষার দাবিতে বৃহস্পতিবার দুপুরে বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। ঝিনাইগাতী সম্মিলিত সচেতন সমাজের আয়োজনে রাঙটিয়া রেঞ্জ কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে পরিবেশবাদী সংগঠন, শিক্ষার্থী, স্বেচ্ছাসেবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ব্যাপক অংশগ্রহণ দেখা যায়।পরিবেশ রক্ষার দাবিতে সরব স্থানীয়রাসমাবেশে অংশ নেওয়া বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা জানান, দীর্ঘদিন ধরেই সীমান্তবর্তী পাহাড়ি বনাঞ্চলে অবৈধভাবে গাছ কাটা, পাহাড় ধ্বংস এবং বনভূমি দখলের অভিযোগ উঠছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যই নষ্ট হচ্ছে না, হুমকির মুখে পড়ছে পুরো অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য।বিক্ষোভে অংশ নেওয়া তরুণদের হাতে ছিল পরিবেশ রক্ষার নানা বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড। “পাহাড় বাঁচাও, প্রকৃতি বাঁচাও”, “বন ধ্বংস বন্ধ করো”, “সবুজ বাঁচলে মানুষ বাঁচবে”—এমন নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে সমাবেশস্থল।স্থানীয় এক পরিবেশকর্মী বলেন, “শেরপুরের পাহাড়ি অঞ্চল একসময় দেশের অন্যতম প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত এলাকা ছিল। কিন্তু অব্যাহত বন উজাড় ও পাহাড় কাটার কারণে এখন সেই পরিবেশ ভয়াবহ সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে আছে।”জীববৈচিত্র্য হারানোর আশঙ্কাসমাবেশে বক্তারা বলেন, সীমান্তের বনাঞ্চল শুধু গাছপালার সমষ্টি নয়; এটি বহু বন্যপ্রাণীর নিরাপদ আবাসস্থল। একসময় যেসব এলাকায় হাতি, বানর, শিয়াল, বনমোরগ ও নানা প্রজাতির পাখির দেখা মিলত, বর্তমানে সেসব প্রাণীর সংখ্যা কমে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।তাদের দাবি, বনাঞ্চল সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় বন্যপ্রাণী লোকালয়ের দিকে চলে আসছে। এতে মানুষ ও বন্যপ্রাণীর মধ্যে সংঘাতের ঘটনাও বাড়ছে। স্থানীয়দের মতে, বন উজাড় অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে এ সংকট আরও প্রকট হতে পারে।নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাসিন্দা জানান, “আগে আমাদের এলাকায় বিভিন্ন বন্যপ্রাণী দেখা যেত। এখন বন কমে যাওয়ায় প্রাণীগুলো লোকালয়ে চলে আসে। এতে ফসল ও মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।”জলবায়ু ও পরিবেশগত ঝুঁকির শঙ্কাসমাবেশে অংশ নেওয়া পরিবেশকর্মীরা বলেন, বনভূমি ধ্বংসের প্রভাব ইতোমধ্যে স্থানীয় জলবায়ুতে পড়তে শুরু করেছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি মাটির ক্ষয় ও খরার প্রবণতা বাড়ছে বলে তারা দাবি করেন।তাদের মতে, পাহাড়ি বনাঞ্চল প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বন কমে গেলে ভূমিক্ষয় ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত অঞ্চলের পরিবেশগত ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।সমাবেশে বক্তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কথা উল্লেখ করে বলেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে আগামী দিনে এ অঞ্চলে বড় ধরনের পরিবেশ সংকট তৈরি হতে পারে।বনখেকোদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’বিক্ষোভ সমাবেশ থেকে বন ও পাহাড় ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির ঘোষণা দেওয়া হয়। বক্তারা অবৈধ বন উজাড়, পাহাড় কাটা ও বনভূমি দখলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।তারা বলেন, পাহাড় ও বন রক্ষা করা শুধু প্রশাসনের দায়িত্ব নয়; স্থানীয় জনগণকেও সচেতন হতে হবে। পরিবেশ রক্ষায় সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা দাবি করেন, সীমান্তের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় প্রশাসন, বন বিভাগ এবং স্থানীয় জনগণের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। একই সঙ্গে বন ধ্বংসের অভিযোগে জড়িতদের বিরুদ্ধে নজরদারি জোরদারের কথাও বলা হয়।পর্যটন সম্ভাবনাও হুমকির মুখেআলোচনায় উঠে আসে শেরপুর সীমান্তের পাহাড়ি অঞ্চলকে ঘিরে পর্যটনের সম্ভাবনার বিষয়টিও। প্রতিবছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ভ্রমণপিপাসুরা ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও শ্রীবরদীর পাহাড়ি সৌন্দর্য উপভোগ করতে আসেন।স্থানীয়দের মতে, বন ও পাহাড় ধ্বংস চলতে থাকলে এ অঞ্চলের পর্যটন শিল্পও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে স্থানীয় অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।একজন তরুণ উদ্যোক্তা বলেন, “পর্যটন নির্ভর অনেক ছোট ব্যবসা এখানে গড়ে উঠছে। কিন্তু পরিবেশ নষ্ট হলে পর্যটক কমে যাবে, যা স্থানীয় মানুষের জীবিকায় প্রভাব ফেলবে।”বিভিন্ন সংগঠনের অংশগ্রহণসমাবেশে অংশ নেয় সেভ দ্যা ওয়াইল্ডলাইফ এন্ড নেচার, সবুজ আন্দোলন বাংলাদেশ, শেরপুর বার্ড কনজারভেশন সোসাইটি ঝিনাইগাতী, বিউটি অফ ঝিনাইগাতী, হাতির খবর ও সচেতনতা, রক্তসৈনিক সংস্থা শ্রীবরদী, বন্ধু ফাউন্ডেশন, প্রশাখা, নালিতাবাড়ি থেকে যা কিছু দেখেছি এবং ঝিনাইগাতী থেকে যা কিছু দেখেছিসহ বিভিন্ন পরিবেশবাদী ও সামাজিক সংগঠন।অংশগ্রহণকারীরা সমাবেশ শেষে পাহাড় ও বন রক্ষায় জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রত্যাশাসমাবেশে বক্তারা বন বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসনের প্রতি কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তারা বলেন, অবৈধ বন উজাড় ও পাহাড় ধ্বংসের অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।প্রকৃতি রক্ষায় সম্মিলিত উদ্যোগের আহ্বানসমাবেশ শেষে আয়োজকরা বলেন, প্রকৃতি ও পরিবেশ রক্ষা করা গেলে মানুষ ও জীববৈচিত্র্য উভয়ই নিরাপদ থাকবে। সীমান্তের পাহাড়ি বনাঞ্চলকে রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। তাদের ভাষায়, “সবুজ বাঁচলে ভবিষ্যৎ বাঁচবে। তাই পাহাড় ও বন রক্ষায় সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

শেরপুর সীমান্তে বন ও পাহাড় রক্ষায় বিক্ষোভ: ‘বনখেকোদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা