গরুর মাংস আমদানির দাবি জোরালো, খামারিদের সুরক্ষায় আপাতত অনড় সরকার
দেশের বাজারে গরুর মাংসের উচ্চমূল্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চাপে সাধারণ মানুষ। এমন বাস্তবতায় সাশ্রয়ী দামে মাংস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদেশ থেকে গরুর মাংস আমদানির অনুমতি চেয়েছেন হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীরা। তবে সরকার স্পষ্ট করেছে, দেশীয় খামারিদের ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনই নেওয়া হবে না।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শহর থেকে মফস্বল—সব জায়গাতেই গরুর মাংস এখন অনেক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। বাজারে কেজিপ্রতি মাংসের দাম কয়েক বছর ধরে উচ্চ অবস্থানে থাকায় মধ্যবিত্ত ও নিম্ন আয়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন এসেছে। এই পরিস্থিতিতে আমদানির প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় এসেছে।রেস্তোরাঁ মালিকদের দাবি, দাম নিয়ন্ত্রণে আমদানির বিকল্প নেইহোটেল-রেস্তোরাঁ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, কাঁচামালের দাম বাড়তে থাকায় ব্যবসা পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষ করে গরুর মাংসনির্ভর খাবারের দাম বাড়াতে বাধ্য হওয়ায় ক্রেতাও কমছে। তাদের মতে, সীমিত পরিসরে হলেও বিদেশ থেকে মাংস আনার অনুমতি দিলে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে এবং দাম কিছুটা কমে আসতে পারে।[TECHTARANGA-POST:1188]খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৬০ হাজারের মতো হোটেল ও রেস্তোরাঁ রয়েছে। শুধু রাজধানী ঢাকাতেই এ সংখ্যা প্রায় ২৫ হাজার। প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ মাংসের চাহিদা থাকলেও বাজারে সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন।ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, বর্তমানে গরুর মাংসের দাম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে সাধারণ মানুষ নিয়মিত কিনতে পারছেন না। এতে শুধু ভোক্তারাই নয়, খাবার ব্যবসাও ক্ষতির মুখে পড়ছে।ব্রাজিলের প্রস্তাব ঘিরে নতুন আলোচনামাংস আমদানির প্রসঙ্গ নতুন নয়। ২০২৪ সালের আগস্টে তৎকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ব্রাজিলের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফরের পর বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। সে সময় ব্রাজিল বাংলাদেশে তুলনামূলক কম দামে গরুর মাংস সরবরাহের আগ্রহ প্রকাশ করেছিল বলে জানা যায়।সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ব্রাজিল প্রতি কেজি গরুর মাংস ৫০০ টাকারও কম দামে সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছিল। বিশ্বের অন্যতম বড় মাংস রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে ব্রাজিল বর্তমানে চীনসহ বিশ্বের বহু দেশে মাংস রপ্তানি করছে।বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদন ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ায় ব্রাজিলের মতো দেশ থেকে আমদানি করলে স্থানীয় বাজারে দামের ওপর চাপ কমতে পারে। তবে এতে দেশীয় খাত কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে, সেটিও বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।সরকার বলছে, দেশীয় খামারিদের সুরক্ষা অগ্রাধিকারমৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, মাংস আমদানির বিষয়ে সরকারের অবস্থানে এখনো কোনো পরিবর্তন আসেনি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দেশে বর্তমানে গবাদিপশু উৎপাদন আগের তুলনায় অনেক বেড়েছে। তাই বিদেশি মাংস আমদানির অনুমতি দিলে স্থানীয় খামারিরা বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে পারেন।মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, সরকার মূলত প্রান্তিক খামারিদের সুরক্ষার বিষয়টি বিবেচনায় রাখছে। অনেক উদ্যোক্তা ঋণ নিয়ে বা সঞ্চয় বিনিয়োগ করে খামার গড়ে তুলেছেন। এমন অবস্থায় কম দামের আমদানি করা মাংস বাজারে এলে তাদের ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হতে পারে।সরকারের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র বলছে, দেশে কোরবানির পশুসহ সারাবছরের চাহিদা মেটাতে এখন স্থানীয় খামারিরাই বড় ভূমিকা রাখছেন। গত এক দশকে পশুপালন খাতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে বলেও দাবি তাদের।[TECHTARANGA-POST:1197]ভারত থেকে গরু আসা বন্ধ হওয়ার পরই বদলে যায় বাজারএকসময় সীমান্তপথে ভারতীয় গরু দেশে প্রবেশ করত। সেই সরবরাহ কমে যাওয়ার পর থেকেই দেশের বাজারে গরুর মাংসের দাম বাড়তে শুরু করে বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ধীরে ধীরে দেশীয় উৎপাদন বাড়লেও দাম আর আগের অবস্থায় ফেরেনি।বাজার সংশ্লিষ্টদের একাংশের অভিযোগ, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগী সিন্ডিকেট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। যদিও এ অভিযোগের বিষয়ে সরকারি কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্তের ফল এখনো প্রকাশ হয়নি।এদিকে কিছু অভিজাত হোটেল ও বড় রেস্তোরাঁ বিশেষ অনুমতিতে হিমায়িত মাংস আমদানি করে থাকে। তবে সেই মাংস সাধারণ খুচরা বাজারে পাওয়া যায় না। ফলে সাধারণ ভোক্তারা এর কোনো সুফল পান না বলেই মনে করছেন অনেকে।ভোক্তারা চান বাজারে প্রতিযোগিতারাজধানীর বিভিন্ন বাজারে ক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অনেক পরিবার এখন আগের তুলনায় কম মাংস কিনছে। কেউ কেউ মাসে এক-দুবারের বেশি গরুর মাংস খেতে পারছেন না।ভোক্তাদের একটি অংশ মনে করছেন, সীমিত আকারে আমদানি চালু হলে বাজারে প্রতিযোগিতা তৈরি হবে। এতে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাও দাম কমাতে বাধ্য হতে পারেন। তবে আবার অনেকে আশঙ্কা করছেন, হঠাৎ আমদানি খুলে দিলে ছোট খামারিরা টিকে থাকতে পারবেন না।অর্থনীতিবিদদের মতে, শুধু আমদানি বা নিষেধাজ্ঞা—দুই দিক দিয়েই সমস্যার সমাধান হবে না। উৎপাদন ব্যয় কমানো, পশুখাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণ, পরিবহন খরচ কমানো এবং বাজার তদারকি বাড়ানোর মতো বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।উৎপাদন খরচ কমানোর পরামর্শ প্রাণিসম্পদ খাতেরপ্রাণিসম্পদ খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, দেশের খামারিরা এখন আগের চেয়ে দক্ষ হলেও পশুখাদ্য, ওষুধ এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচও বেড়েছে। ফলে বাজারে কম দামে মাংস বিক্রি করা অনেকের পক্ষেই সম্ভব হচ্ছে না।তাদের মতে, বিদেশ থেকে মাংস আনার বদলে যদি খামারিদের জন্য ভর্তুকি, সহজ ঋণ এবং পশুখাদ্যে সহায়তা বাড়ানো যায়, তাহলে উৎপাদন খরচ কমবে। এতে ভোক্তারাও তুলনামূলক কম দামে মাংস কিনতে পারবেন।সামাজিক প্রভাবও বাড়ছেবিশ্লেষকরা বলছেন, গরুর মাংস শুধু একটি খাদ্যপণ্য নয়, এটি অনেক পরিবারের পুষ্টির বড় উৎস। দাম দীর্ঘসময় বেশি থাকলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের খাদ্যতালিকায় প্রোটিনের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বাজারে অস্থিরতা বাড়লে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় আরও চাপের মুখে পড়বে।'[TECHTARANGA-POST:1198]অন্যদিকে, পশুপালন খাত বাংলাদেশের গ্রামীণ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। লাখো মানুষ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এই খাতের সঙ্গে যুক্ত। ফলে আমদানি নিয়ে যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু বাজারেই নয়, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগেও পড়তে পারে।আপাতত সিদ্ধান্তে পরিবর্তনের ইঙ্গিত নেইবর্তমান পরিস্থিতিতে সরকার দেশীয় উৎপাদনকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে। যদিও বাজারে দামের চাপ কমাতে কী ধরনের নতুন উদ্যোগ নেওয়া হবে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি। ফলে গরুর মাংস আমদানির আলোচনা চললেও বাস্তবে দ্রুত কোনো সিদ্ধান্ত আসছে না বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে বাজার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ না এলে ভবিষ্যতে আমদানির দাবি আরও জোরালো হতে পারে বলে ধারণা ব্যবসায়ী ও ভোক্তা—উভয় পক্ষের।