ইরান থেকে তেল কেনার অভিযোগে চীনের একটি বড় তেল শোধনাগারের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির মাঝেই এই পদক্ষেপ নেওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, চীনের হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল (ডালিয়ান) রিফাইনারিকে লক্ষ্য করে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি ইরানের অপরিশোধিত তেল এবং বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় ক্রেতাদের একটি, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অধীনস্থ অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (OFAC) শুধু এই রিফাইনারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন তেল পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০টি জাহাজ ও শিপিং কোম্পানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এই নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল রপ্তানিতে কিছুটা চাপ তৈরি করলেও এর বড় ক্রেতা চীন হওয়ায় পুরো বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন তৎক্ষণাৎ দেখা নাও যেতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের মতে, ২০২৫ সালে ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া মোট তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছে চীন। ফলে এই দুই দেশের তেল বাণিজ্য এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মার্কিন সম্পদ জব্দ করে এবং তাদের সঙ্গে আমেরিকান নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করা নিষিদ্ধ করে। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় যারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, তারা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে।
তবে চীনের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। দেশটির বড় স্বাধীন রিফাইনারিগুলো (যাদের “টিপট রিফাইনারি” বলা হয়) তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়। কারণ তারা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয় এবং অনেক সময় বিকল্প পদ্ধতিতে লেনদেন সম্পন্ন করে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ইরানের তেল রপ্তানি বড়ভাবে কমাতে চায়, তাহলে শুধু রিফাইনারি নয়—চীনা ব্যাংকগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ তেল কেনাবেচার অর্থ লেনদেনের মূল কেন্দ্রই হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। সেই জায়গায় বাধা সৃষ্টি করা গেলে ইরানের জন্য বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর থেকেই ইরান বিকল্প উপায়ে তেল বিক্রির পথ খুঁজতে থাকে। সেই সুযোগে চীন হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ক্রেতা।
অন্যদিকে, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। তাদের শিল্প খাত সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ তেলের প্রয়োজন হয়। ফলে কম দামে ইরানের তেল পাওয়া গেলে সেটি তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের তেল বিক্রির সঙ্গে জড়িত জাহাজ, মধ্যস্থতাকারী ও ক্রেতাদের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, ইরানের এই নেটওয়ার্ককে সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে পদক্ষেপ নিয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে, নতুন এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়াতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী দিনের কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।
বিষয় : ইরানের রিফাইনারির নিষেধাজ্ঞা

শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ এপ্রিল ২০২৬
ইরান থেকে তেল কেনার অভিযোগে চীনের একটি বড় তেল শোধনাগারের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। ওয়াশিংটন ও ইরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফার সম্ভাব্য শান্তি আলোচনার প্রস্তুতির মাঝেই এই পদক্ষেপ নেওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
ব্রিটিশ সংবাদ সংস্থা রয়টার্স জানায়, চীনের হেংলি পেট্রোকেমিক্যাল (ডালিয়ান) রিফাইনারিকে লক্ষ্য করে এই নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে মার্কিন ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি ইরানের অপরিশোধিত তেল এবং বিভিন্ন পেট্রোলিয়াম পণ্যের বড় ক্রেতাদের একটি, যা আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে।
মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অধীনস্থ অফিস অব ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (OFAC) শুধু এই রিফাইনারির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি। তারা ইরানের তথাকথিত ‘শ্যাডো ফ্লিট’ বা গোপন তেল পরিবহন নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪০টি জাহাজ ও শিপিং কোম্পানির ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এই নেটওয়ার্ককে ব্যবহার করে ইরান দীর্ঘদিন ধরে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে তেল রপ্তানি করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞা ইরানের তেল রপ্তানিতে কিছুটা চাপ তৈরি করলেও এর বড় ক্রেতা চীন হওয়ায় পুরো বাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন তৎক্ষণাৎ দেখা নাও যেতে পারে। তথ্য বিশ্লেষণ সংস্থা কেপলারের মতে, ২০২৫ সালে ইরান থেকে রপ্তানি হওয়া মোট তেলের ৮০ শতাংশেরও বেশি কিনেছে চীন। ফলে এই দুই দেশের তেল বাণিজ্য এক ধরনের পারস্পরিক নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা সাধারণত সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের মার্কিন সম্পদ জব্দ করে এবং তাদের সঙ্গে আমেরিকান নাগরিক বা প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা করা নিষিদ্ধ করে। ফলে আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় যারা যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল, তারা বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়ে।
তবে চীনের ক্ষেত্রে চিত্রটা কিছুটা ভিন্ন। দেশটির বড় স্বাধীন রিফাইনারিগুলো (যাদের “টিপট রিফাইনারি” বলা হয়) তুলনামূলকভাবে কম প্রভাবিত হয়। কারণ তারা আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয় এবং অনেক সময় বিকল্প পদ্ধতিতে লেনদেন সম্পন্ন করে থাকে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ইরানের তেল রপ্তানি বড়ভাবে কমাতে চায়, তাহলে শুধু রিফাইনারি নয়—চীনা ব্যাংকগুলোর ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে হবে। কারণ তেল কেনাবেচার অর্থ লেনদেনের মূল কেন্দ্রই হচ্ছে ব্যাংকিং ব্যবস্থা। সেই জায়গায় বাধা সৃষ্টি করা গেলে ইরানের জন্য বাজার ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, ২০১৮ সালে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে হওয়া পারমাণবিক চুক্তি থেকে সরে এসে পুনরায় কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এরপর থেকেই ইরান বিকল্প উপায়ে তেল বিক্রির পথ খুঁজতে থাকে। সেই সুযোগে চীন হয়ে ওঠে তাদের প্রধান ক্রেতা।
অন্যদিকে, চীন বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি আমদানিকারক দেশগুলোর একটি। তাদের শিল্প খাত সচল রাখতে বিপুল পরিমাণ তেলের প্রয়োজন হয়। ফলে কম দামে ইরানের তেল পাওয়া গেলে সেটি তাদের জন্য অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হয়ে ওঠে।
মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, ইরানের তেল বিক্রির সঙ্গে জড়িত জাহাজ, মধ্যস্থতাকারী ও ক্রেতাদের ওপর নজরদারি আরও জোরদার করা হবে। তিনি বলেন, ইরানের এই নেটওয়ার্ককে সীমিত করতে যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে পদক্ষেপ নিয়ে যাবে।
সব মিলিয়ে, নতুন এই নিষেধাজ্ঞা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে চাপ বাড়াতে পারে এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইরান ও চীনের মধ্যে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও জটিল করে তুলতে পারে। পরিস্থিতি কোন দিকে যায়, তা অনেকটাই নির্ভর করবে আগামী দিনের কূটনৈতিক আলোচনার ওপর।

আপনার মতামত লিখুন