দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় এবার রাজধানী ঢাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই লোডশেডিং চলছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ঢাকাতেও সীমিত পরিসরে লোডশেডিং চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় একটি কারণ হলো শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বৈষম্য কমানো। তিনি বলেন, “শহরের মানুষ আরামে থাকবে আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তাই সবার জন্য সমানভাবে বিদ্যুৎ বণ্টনের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে রাজধানীতে প্রায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তবে এটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি দেখালেও বাস্তবে জ্বালানি ঘাটতির কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিশেষ করে গ্যাস সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের কাছে অর্থ থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এলএনজি আমদানি, গ্যাস সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়ে। কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রম চালু থাকায় গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ খাতে গত এক দশকে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখনো খুব বেশি বাড়েনি। সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রাজধানীতে লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে সমতা আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকেই আশঙ্কা করছেন এতে নগর জীবনে ভোগান্তি বাড়বে।
ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ঢাকায় পরীক্ষামূলক লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে জ্বালানি খাতে টেকসই পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। তাহলেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৩ এপ্রিল ২০২৬
দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় এবার রাজধানী ঢাকাতেও পরীক্ষামূলকভাবে লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জাতীয় সংসদে এ তথ্য জানিয়েছেন, যা সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে আলোচনা তৈরি করেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জ্বালানি সরবরাহে ঘাটতির কারণে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আগে থেকেই লোডশেডিং চলছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সরকার ঢাকাতেও সীমিত পরিসরে লোডশেডিং চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী জানান, এই সিদ্ধান্তের পেছনে বড় একটি কারণ হলো শহর ও গ্রামের মধ্যে বিদ্যুৎ ব্যবহারের বৈষম্য কমানো। তিনি বলেন, “শহরের মানুষ আরামে থাকবে আর গ্রামের মানুষ কষ্টে থাকবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।” তাই সবার জন্য সমানভাবে বিদ্যুৎ বণ্টনের লক্ষ্যেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে রাজধানীতে প্রায় ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং বাস্তবায়ন করা হতে পারে। তবে এটি পরীক্ষামূলকভাবে শুরু হবে এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান বিদ্যুৎ সংকট হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। দীর্ঘদিনের নানা সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার কারণে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। কাগজে-কলমে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বেশি দেখালেও বাস্তবে জ্বালানি ঘাটতির কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিশেষ করে গ্যাস সংকট বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলছে। প্রতিমন্ত্রী জানান, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও বর্তমানে সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ২ হাজার ৬৩৬ মিলিয়ন ঘনফুট। ফলে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ১৬৪ মিলিয়ন ঘনফুট ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের কাছে অর্থ থাকলেও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে দ্রুত গ্যাস আমদানি বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। এলএনজি আমদানি, গ্যাস সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও এই সংকটকে দীর্ঘায়িত করছে।
বাংলাদেশে এর আগেও বিভিন্ন সময়ে বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে গ্রীষ্ম মৌসুমে চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় লোডশেডিং বাড়ে। কৃষি খাতে সেচ কার্যক্রম চালু থাকায় গ্রামীণ এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা আরও বৃদ্ধি পায়, যা সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ সৃষ্টি করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিদ্যুৎ খাতে গত এক দশকে উৎপাদন ক্ষমতা অনেক বেড়েছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং বিতরণ ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে একটি বড় ফাঁক তৈরি হচ্ছে।
এছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার এখনো খুব বেশি বাড়েনি। সৌরবিদ্যুৎ বা বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প বাড়ানো গেলে ভবিষ্যতে এই ধরনের সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে রাজধানীতে লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্তে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ কেউ এটিকে সমতা আনার উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন, আবার অনেকেই আশঙ্কা করছেন এতে নগর জীবনে ভোগান্তি বাড়বে।
ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও এর প্রভাব পড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের ওপর জোর দেওয়ার কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে বলা যায়, বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় ঢাকায় পরীক্ষামূলক লোডশেডিং চালুর সিদ্ধান্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তবে দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যার সমাধান করতে হলে জ্বালানি খাতে টেকসই পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। তাহলেই দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হবে।

আপনার মতামত লিখুন