দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ
প্রকাশ : বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

পবিপ্রবিতে শিক্ষকদের ওপর হামলা: ‘বহিরাগতদের’ সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন বিতর্ক, এমপির অনুসারীদের নাম আসছে আলোচনায়

পবিপ্রবিতে শিক্ষকদের ওপর হামলা: ‘বহিরাগতদের’ সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন বিতর্ক, এমপির অনুসারীদের নাম আসছে আলোচনায়

নারায়ণগঞ্জে গোলাপি এলবিনো মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ঘিরে কৌতূহলের ঢল, ৭০০ কেজির প্রাণী এখন ভাইরাল

টেকনাফে যৌথ অভিযানে বুলেটপ্রুফ জ্যাকেট ও গোলাবারুদ উদ্ধার

ঈদ সামনে, চাঁদাবাজি ঠেকাতে কড়া অবস্থানে সরকার; পশুর হাটে থাকবে বিশেষ নজরদারি

নতুন রূপে ফিরছে প্যাকেজ ভ্যাট, অনলাইনে মিলবে তাৎক্ষণিক বিআইএন

চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবারও নেই ম্যাংগো ক্যালেন্ডার, পাকা হলেই বিক্রি করা যাবে আম

জানালার গ্রীল কেটে রাণীনগরের দোকানে চুরি, নগদসহ প্রায় ৭ লাখ টাকার মালামাল উধাও

কলেজ ফাঁকি দিয়ে নরসিংদী ভ্রমণ, মেঘনায় নিখোঁজ বিএএফ শাহীন কলেজের শিক্ষার্থী

পবিপ্রবিতে শিক্ষকদের ওপর হামলা: ‘বহিরাগতদের’ সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন বিতর্ক, এমপির অনুসারীদের নাম আসছে আলোচনায়

পবিপ্রবিতে শিক্ষকদের ওপর হামলা: ‘বহিরাগতদের’ সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন বিতর্ক, এমপির অনুসারীদের নাম আসছে আলোচনায়
পবিপ্রবির প্রশাসনিক ভবনের সামনে শিক্ষক-কর্মকর্তাদের অবস্থান কর্মসূচির একাংশ। -ছবি: সংগৃহীত

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবির সূত্র ধরে দাবি উঠেছে, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁরা পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী–এর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ, উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে চলমান আন্দোলন দমিয়ে দিতে পরিকল্পিতভাবে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে আনা হয়। হামলায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও অভিযুক্তদের কয়েকজন বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে, তবে এটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল না।

আন্দোলনের মধ্যেই উত্তেজনা

গত সোমবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাঁদের মূল দাবি ছিল উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁকে অপসারণ করা।


আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে একদল বহিরাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে আসে। আনসার সদস্যরা প্রথমে বাধা দিলেও পরে চাপের মুখে গেট খুলে দেওয়া হয়। এরপরই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে বলেন, বহিরাগতরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ায়। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরে চেয়ারসহ বিভিন্ন বস্তু দিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন শিক্ষককে মাটিতে ফেলে পেটানোর অভিযোগও ওঠে।

যাঁদের নাম উঠে আসছে

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দৃশ্যে কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীর উপস্থিতি দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ বশির উদ্দিন, যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্যসচিব রিপন শরীফ, তাঁর ভাই শিপন শরীফ, যুবদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী, ছাত্রদল ও কৃষক দলের নেতাসহ আরও অনেকে।

ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কয়েকজনকে বহিষ্কারের কথাও জানিয়েছে স্থানীয় বিএনপি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় বশির উদ্দিন, আহসান ফারুক, সুলতান শওকত, হেলেনা খানম, মুসা মৃধা, সৈয়দ শামীম ও আব্দুল ওহাবকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযুক্ত রিপন শরীফ দাবি করেছেন, তাঁরা শুনেছিলেন উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সেই খবর শুনেই তাঁরা সেখানে যান। তাঁর ভাষ্য, “পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু আগে থেকে হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।”

তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে কিছু জানতেন না এবং ঘটনাটি “অনাকাঙ্ক্ষিত”।

‘ভিসিকে রক্ষায় হামলা’— অভিযোগ শিক্ষকদের

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলন জোরদার হওয়ায় প্রশাসনের একটি অংশ তাঁকে রক্ষায় রাজনৈতিক সমর্থন খুঁজছিল।

তাঁদের অভিযোগ, হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে উপাচার্যের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। এমনকি একজন নেতাকে উপাচার্যের আত্মীয় বলেও দাবি করেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবুল বাশার খান বলেন, অভিযুক্তদের একজন এর আগেও তাঁর অফিসে এসে উপাচার্যকে “দেখে রাখার” কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, ঘটনার দিন যারা ক্যাম্পাসে ঢুকেছিলেন, তাঁদের বড় অংশ উপাচার্যের পক্ষ নিয়েই এসেছিলেন।


তবে বশির উদ্দিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “ভিসি আত্মীয় হলেও তাঁর জন্য যাইনি। গেট বন্ধ থাকায় ভেতরে গিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যায়।”

উপাচার্যের বক্তব্যেও পাল্টা অভিযোগ

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম সরাসরি হামলার দায় স্বীকার না করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেই পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন।

তিনি বলেন, কিছু শিক্ষক ও কর্মকর্তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন জানিয়ে বলেন, ক্যাম্পাসে ফিরে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে, কিন্তু আন্দোলনকারীরা কর্মসূচির নামে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করছেন।

রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা

ঘটনার পর স্থানীয় রাজনীতিতেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কারণ হামলায় অভিযুক্তদের বড় একটি অংশ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে আলোচনা চলছে।

দুমকী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. খলিলুর রহমান বলেন, ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে হামলাকারীরা সংসদ সদস্যের অনুসারী কি না—এ প্রশ্নে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি। শুধু বলেন, “এমনটা হয়ে থাকলে সেটি অবশ্যই দুঃখজনক।”

অন্যদিকে সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী দেশের বাইরে থাকায় তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আন্দোলন থামছে না

হামলার ঘটনার পর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট চলছে। মঙ্গলবার প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা হামলার বিচার, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং উপাচার্যের অপসারণ দাবি করেন।


শিক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ঢুকে হামলা চালানোর ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের মতে, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সামাজিক প্রভাব ও উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণত মুক্তবুদ্ধি ও নিরাপদ মতপ্রকাশের জায়গা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এবং বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পবিপ্রবির ঘটনাও সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সংকট নয়, বরং শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে এবং শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এখন কী হচ্ছে

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। আহত কয়েকজন শিক্ষক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। ফলে পবিপ্রবিতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কবে পুরোপুরি চালু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।

বিষয় : পটুয়াখালী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক লাঞ্ছনা, আলতাফ হোসেন চৌধুরী

আপনার মতামত লিখুন

পরবর্তী খবর
দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

বুধবার, ১৩ মে ২০২৬


পবিপ্রবিতে শিক্ষকদের ওপর হামলা: ‘বহিরাগতদের’ সম্পৃক্ততা নিয়ে নতুন বিতর্ক, এমপির অনুসারীদের নাম আসছে আলোচনায়

প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬

featured Image

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (পবিপ্রবি) শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ওপর হামলার ঘটনায় নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ছবির সূত্র ধরে দাবি উঠেছে, হামলায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের অনেকেই স্থানীয় বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত এবং তাঁরা পটুয়াখালী-১ আসনের সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী–এর অনুসারী হিসেবে পরিচিত।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের অভিযোগ, উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতি, অনিয়ম ও স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগে চলমান আন্দোলন দমিয়ে দিতে পরিকল্পিতভাবে বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে আনা হয়। হামলায় অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও অভিযুক্তদের কয়েকজন বলছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে, তবে এটি পূর্বপরিকল্পিত ছিল না।

আন্দোলনের মধ্যেই উত্তেজনা

গত সোমবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছিলেন শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা। তাঁদের মূল দাবি ছিল উপাচার্যের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া এবং তাঁকে অপসারণ করা।


আন্দোলনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সকাল সাড়ে ৯টার দিকে মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে একদল বহিরাগত বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল ফটকে আসে। আনসার সদস্যরা প্রথমে বাধা দিলেও পরে চাপের মুখে গেট খুলে দেওয়া হয়। এরপরই ক্যাম্পাসে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীদের অনেকে বলেন, বহিরাগতরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে গিয়ে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডায় জড়ায়। একপর্যায়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া শুরু হয়। পরে চেয়ারসহ বিভিন্ন বস্তু দিয়ে মারধরের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন শিক্ষককে মাটিতে ফেলে পেটানোর অভিযোগও ওঠে।

যাঁদের নাম উঠে আসছে

বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের সংগ্রহ করা ভিডিও ফুটেজ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দৃশ্যে কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীর উপস্থিতি দেখা গেছে বলে দাবি করা হচ্ছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির কোষাধ্যক্ষ বশির উদ্দিন, যুবদলের বহিষ্কৃত সদস্যসচিব রিপন শরীফ, তাঁর ভাই শিপন শরীফ, যুবদলের কয়েকজন নেতা-কর্মী, ছাত্রদল ও কৃষক দলের নেতাসহ আরও অনেকে।

ঘটনার পর দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে কয়েকজনকে বহিষ্কারের কথাও জানিয়েছে স্থানীয় বিএনপি। দলীয় সূত্রগুলো বলছে, হামলার ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় বশির উদ্দিন, আহসান ফারুক, সুলতান শওকত, হেলেনা খানম, মুসা মৃধা, সৈয়দ শামীম ও আব্দুল ওহাবকে সংগঠন থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

তবে অভিযুক্ত রিপন শরীফ দাবি করেছেন, তাঁরা শুনেছিলেন উপাচার্যকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। সেই খবর শুনেই তাঁরা সেখানে যান। তাঁর ভাষ্য, “পরিস্থিতি খারাপ হয়ে যায়, কিন্তু আগে থেকে হামলার কোনো পরিকল্পনা ছিল না।”

তিনি আরও বলেন, সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী এ বিষয়ে কিছু জানতেন না এবং ঘটনাটি “অনাকাঙ্ক্ষিত”।

‘ভিসিকে রক্ষায় হামলা’— অভিযোগ শিক্ষকদের

বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষক ও কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দাবি করেন, উপাচার্যের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। আন্দোলন জোরদার হওয়ায় প্রশাসনের একটি অংশ তাঁকে রক্ষায় রাজনৈতিক সমর্থন খুঁজছিল।

তাঁদের অভিযোগ, হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া কয়েকজন স্থানীয় রাজনৈতিক কর্মীর সঙ্গে উপাচার্যের ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিল। এমনকি একজন নেতাকে উপাচার্যের আত্মীয় বলেও দাবি করেন তাঁরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক ড. আবুল বাশার খান বলেন, অভিযুক্তদের একজন এর আগেও তাঁর অফিসে এসে উপাচার্যকে “দেখে রাখার” কথা বলেছিলেন। তাঁর মতে, ঘটনার দিন যারা ক্যাম্পাসে ঢুকেছিলেন, তাঁদের বড় অংশ উপাচার্যের পক্ষ নিয়েই এসেছিলেন।


তবে বশির উদ্দিন এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, “ভিসি আত্মীয় হলেও তাঁর জন্য যাইনি। গেট বন্ধ থাকায় ভেতরে গিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলাম। পরে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে যায়।”

উপাচার্যের বক্তব্যেও পাল্টা অভিযোগ

এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. কাজী রফিকুল ইসলাম সরাসরি হামলার দায় স্বীকার না করে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধেই পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন।

তিনি বলেন, কিছু শিক্ষক ও কর্মকর্তা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন জানিয়ে বলেন, ক্যাম্পাসে ফিরে তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে।

উপাচার্যের ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল রাখার চেষ্টা চলছে, কিন্তু আন্দোলনকারীরা কর্মসূচির নামে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত করছেন।

রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে আলোচনা

ঘটনার পর স্থানীয় রাজনীতিতেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। কারণ হামলায় অভিযুক্তদের বড় একটি অংশ বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে আলোচনা চলছে।

দুমকী উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. খলিলুর রহমান বলেন, ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে দলীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এবং আরও ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তবে হামলাকারীরা সংসদ সদস্যের অনুসারী কি না—এ প্রশ্নে তিনি সরাসরি কিছু বলেননি। শুধু বলেন, “এমনটা হয়ে থাকলে সেটি অবশ্যই দুঃখজনক।”

অন্যদিকে সংসদ সদস্য আলতাফ হোসেন চৌধুরী দেশের বাইরে থাকায় তাঁর আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আন্দোলন থামছে না

হামলার ঘটনার পর শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের আন্দোলন আরও তীব্র হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মবিরতি ও অবস্থান ধর্মঘট চলছে। মঙ্গলবার প্রশাসনিক ভবনের সামনে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা হামলার বিচার, জড়িতদের গ্রেপ্তার এবং উপাচার্যের অপসারণ দাবি করেন।


শিক্ষকদের একটি অংশ বলছেন, ক্যাম্পাসে বহিরাগতদের ঢুকে হামলা চালানোর ঘটনা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ও স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। তাঁদের মতে, এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

সামাজিক প্রভাব ও উদ্বেগ

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধারণত মুক্তবুদ্ধি ও নিরাপদ মতপ্রকাশের জায়গা হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিভিন্ন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দ্বন্দ্ব এবং বহিরাগতদের হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। পবিপ্রবির ঘটনাও সেই আলোচনাকে নতুন করে সামনে এনেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠলে সেটি শুধু একটি প্রশাসনিক সংকট নয়, বরং শিক্ষাঙ্গনের সামগ্রিক পরিবেশের ওপরও প্রভাব ফেলে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হতে পারে এবং শিক্ষা কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এখন কী হচ্ছে

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি। আহত কয়েকজন শিক্ষক চিকিৎসা নিয়েছেন এবং হামলায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের দাবি জানানো হয়েছে।

এদিকে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের কর্মসূচি চলবে। ফলে পবিপ্রবিতে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম কবে পুরোপুরি চালু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত।


দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর

প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর