ছাতড়া বিলে শ্রমিক সংকটে ধান কাটা ব্যাহত, মজুরি দ্বিগুণ হওয়ায় বিপাকে কৃষকেরা
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া বিলে বোরো ধান কাটা ঘিরে হঠাৎ তৈরি হয়েছে অস্থিরতা। আকাশে মেঘ দেখলেই আতঙ্কে মাঠে নেমে পড়ছেন কৃষকেরা, কিন্তু একসঙ্গে সবাই কাজ শুরু করায় দেখা দিয়েছে তীব্র শ্রমিক সংকট। ফলে ধান কাটার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গিয়ে বিপাকে পড়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।বিলজুড়ে এখন এক অদ্ভুত ব্যস্ততা—কেউ ধান কাটছেন, কেউ মাড়াই করছেন, আবার কেউ শ্রমিকের খোঁজে ঘুরছেন এ মাঠ থেকে ও মাঠে। অথচ কিছুদিন আগেও যে কাজ স্বাভাবিক গতিতে চলছিল, তা এখন যেন দুশ্চিন্তার বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।ছাতড়া বিলে বোরো ধান কাটাকে ঘিরে পরিস্থিতিনিয়ামতপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি ছাতড়া বিল এলাকায় এবার প্রায় ২ হাজার ১৭ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ হয়েছে। প্রায় ২৪ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই বিল কৃষি উৎপাদনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত।তবে এই বিলের ভৌগোলিক অবস্থানই এখন কৃষকের জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। শিব নদীর সঙ্গে যুক্ত একটি খাল থাকায় পাহাড়ি ঢল বা টানা বৃষ্টিতে দ্রুত পানি বেড়ে পুরো ফসল ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এ কারণেই আকাশের অবস্থা খারাপ দেখলেই কৃষকেরা একসঙ্গে ধান কাটতে নেমে পড়েন।একসঙ্গে ধান কাটতে নামায় শ্রমিক সংকটএবারের মৌসুমে কয়েকদিন ধরে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা দেখা দেওয়ায় একই সময়ে প্রায় সব কৃষক মাঠে নেমে পড়েন। কিন্তু হঠাৎ করে এত বেশি কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয় শ্রমিক সংকট তীব্র আকার ধারণ করে।ফলে ধান কাটার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। যারা আছেন, তাদের চাহিদা এত বেড়েছে যে মজুরি প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে বলে অভিযোগ কৃষকদের।জন্তইল গ্রামের কৃষক ফিরোজ হোসেন বলেন,
“আকাশের অবস্থা ভালো না। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। কিন্তু শ্রমিক পাচ্ছি না। পুরো বিলের এক-তৃতীয়াংশ ধান এখনো কাটা হয়নি। এই অবস্থায় খুব দুশ্চিন্তায় আছি।”একই গ্রামের কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, এবার শ্রমিকের অভাব এতটাই তীব্র যে মজুরি বহুগুণ বেড়ে গেছে। তিনি বলেন,
“গত বছর যেখানে মণপ্রতি ৫-৬ কেজি ধান দিলেই শ্রমিক পাওয়া যেত, এবার ২০ কেজি দিলেও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বেশি মজুরি দিয়েই ধান কাটতে হচ্ছে।”শ্রমিকদের ভিন্ন অভিজ্ঞতাঅন্যদিকে শ্রমিকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিক মিনহাজুল জানান, এবারের কাজ তুলনামূলক কঠিন হওয়ায় সময় বেশি লাগছে।তিনি বলেন,
“ঝড়ো বাতাসে অনেক ধান মাটিতে পড়ে গেছে। এসব ধান কাটতে সময় বেশি লাগে। ১৩ জন মিলে সারাদিনে দুই বিঘার ধানও শেষ করতে পারছি না। তাই একটু বেশি মজুরি নিতে হচ্ছে।”শ্রমিকদের এই বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, শুধু চাহিদা নয়, কাজের জটিলতাও মজুরি বৃদ্ধির একটি বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।ধানের দাম নিয়ে কৃষকের হতাশাশ্রমিক সংকটের পাশাপাশি কৃষকের আরেকটি বড় দুশ্চিন্তার কারণ হলো বাজারে ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়া।স্থানীয় কৃষক রহমান অভিযোগ করেন,
“ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ মণপ্রতি ৮০০ টাকা দাম বলছে, তাও আবার বাকিতে। এতে করে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।”ফলে একদিকে উৎপাদন খরচ বাড়ছে, অন্যদিকে বাজার মূল্য কম থাকায় কৃষকেরা দ্বিমুখী চাপের মধ্যে পড়েছেন।কৃষি বিভাগের উদ্যোগবর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কৃষি বিভাগ বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম বলেন,
“ছাতড়া বিলে এ বছর ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। তবে হঠাৎ করে শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় আমরা কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মেশিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে কম সময়ে বেশি জমির ধান কাটা সম্ভব হবে।”তিনি আরও জানান, কৃষকদের দ্রুত ফসল ঘরে তোলার জন্য প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে।বিশেষজ্ঞদের মতামত ও প্রভাবকৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাঞ্চলের বিল ও হাওর এলাকায় প্রতি বছরই এই ধরনের সংকট দেখা দেয়। আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা থাকায় কৃষকেরা একসঙ্গে ফসল কাটতে বাধ্য হন, যার ফলে স্বল্প সময়ে শ্রমিকের চাহিদা বেড়ে যায়।এ পরিস্থিতির কারণে—
শ্রমিক সংকট তৈরি হয়
মজুরি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়
কৃষকের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পায়
লাভের পরিমাণ কমে যায়
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানো এবং আগাম পরিকল্পনা গ্রহণ করলে এই সমস্যা অনেকাংশে কমানো সম্ভব।প্রশাসনিক ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তাস্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে কৃষকদের প্রত্যাশা রয়েছে। অনেকেই মনে করেন, সংকটকালীন সময়ে শ্রমিক ও যন্ত্রের সমন্বিত ব্যবস্থা আরও জোরদার করা দরকার।এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে, তবে তাদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।উপসংহারছাতড়া বিলে চলমান ধান কাটার সংকট এখন কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি, অন্যদিকে বাজারে ধানের কম দাম—সব মিলিয়ে কৃষকেরা এক কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি।তবে কৃষি বিভাগ যদি দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকে, তাহলে ধান কাটা দ্রুত শেষ করে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতি আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে—কৃষির ভবিষ্যৎ টেকসই করতে প্রযুক্তি ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার কোনো বিকল্প নেই।