শ্রমিক সংকটে থমকে নিয়ামতপুরের ছাতড়া বিলে ধান কাটা, মজুরি দ্বিগুণ
নওগাঁর নিয়ামতপুর উপজেলার ছাতড়া বিলে বোরো ধান কাটাকে ঘিরে তৈরি হয়েছে অস্থির পরিস্থিতি। বৃষ্টির আশঙ্কায় একসঙ্গে ধান কাটতে নেমে পড়ায় তীব্র শ্রমিক সংকট দেখা দিয়েছে। এতে করে ধান কাটার মজুরি হঠাৎ করেই দ্বিগুণেরও বেশি বেড়ে গেছে বলে অভিযোগ করছেন কৃষকেরা।জানা গেছে, নিয়ামতপুর উপজেলার সবচেয়ে বড় জলাভূমি ছাতড়া বিল এলাকায় এবার প্রায় ২ হাজার ১৭ বিঘা জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। প্রায় ২৪ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত এই বিলে প্রতিবছরই ব্যাপক পরিমাণ ধান উৎপাদন হয়। তবে বিলের ভেতর দিয়ে একটি খাল শিব নদীর সঙ্গে যুক্ত থাকায় আগাম বৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে পানি বেড়ে গেলে পুরো ফসল তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই আকাশে মেঘ দেখলেই কৃষকেরা দ্রুত ধান কাটার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন।[TECHTARANGA-POST:969]এবারও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কয়েকদিন ধরে আবহাওয়ার অবস্থা অনিশ্চিত থাকায় হঠাৎ করে প্রায় সব কৃষক একসঙ্গে ধান কাটতে মাঠে নেমে পড়েছেন। কিন্তু একসঙ্গে এত কাজ শুরু হওয়ায় প্রয়োজনীয় শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শ্রমিক সংকট এখন বড় সমস্যায় পরিণত হয়েছে।জন্তইল গ্রামের কৃষক ফিরোজ হোসেন বলেন, “আকাশের অবস্থা ভালো না। যেকোনো সময় বৃষ্টি নামতে পারে। কিন্তু শ্রমিক পাচ্ছি না। পুরো বিলের এক-তৃতীয়াংশ ধান এখনো কাটা হয়নি। এই অবস্থায় খুব দুশ্চিন্তায় আছি।”একই গ্রামের আরেক কৃষক শরিফুল ইসলাম জানান, গত বছরের তুলনায় এবার শ্রমিকের মজুরি অনেক বেশি। তিনি বলেন, “গত বছর যেখানে মণপ্রতি ৫-৬ কেজি ধান দিলেই শ্রমিক পাওয়া যেত, এবার ২০ কেজি দিতে চাইলেও লোক পাওয়া যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে বেশি মজুরি দিয়েই ধান কাটতে হচ্ছে।”অন্যদিকে, বাইরে থেকে আসা শ্রমিকদের বক্তব্য ভিন্ন। চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে আসা শ্রমিক মিনহাজুল জানান, এবার কাজ করতে বেশি সময় লাগছে। তিনি বলেন, “ঝড়ো বাতাসে অনেক ধান মাটিতে পড়ে গেছে। এসব ধান কাটতে সময় বেশি লাগে। ১৩ জন মিলে সারাদিনে দুই বিঘার ধানও শেষ করতে পারছি না। তাই একটু বেশি মজুরি নিতে হচ্ছে।”এদিকে ধান উৎপাদন খরচ বাড়লেও বাজারে ধানের দাম নিয়ে হতাশ কৃষকেরা। স্থানীয় কৃষক রহমান অভিযোগ করেন, “ধানের ফলন ভালো হলেও বাজারে ন্যায্য দাম পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ কেউ মণপ্রতি ৮০০ টাকা দাম বলছে, তাও আবার বাকিতে। এতে করে আমাদের লোকসান গুনতে হচ্ছে।”[TECHTARANGA-POST:958]কৃষি বিভাগ বলছে, পরিস্থিতি সামাল দিতে তারা বিকল্প ব্যবস্থা নিচ্ছে। নিয়ামতপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রফিকুল ইসলাম জানান, “ছাতড়া বিলে এ বছর ধানের ফলন খুব ভালো হয়েছে। তবে হঠাৎ করে শ্রমিক সংকট দেখা দেওয়ায় আমরা কম্বাইন হারভেস্টার মেশিন ব্যবহার করার পরামর্শ দিচ্ছি এবং প্রয়োজন অনুযায়ী মেশিনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে কম সময়ে বেশি জমির ধান কাটা সম্ভব হবে।”দেশের উত্তরাঞ্চলের বিল এলাকায় প্রতিবছরই বোরো মৌসুমে একই ধরনের চিত্র দেখা যায়। বিশেষ করে হাওর বা বিল অঞ্চলে আবহাওয়ার ওপর নির্ভরতা বেশি হওয়ায় কৃষকেরা ঝুঁকি এড়াতে একসঙ্গে ফসল কাটতে চান। এতে করে স্বল্প সময়ের জন্য শ্রমিক সংকট তৈরি হয় এবং মজুরি বেড়ে যায়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষি যান্ত্রিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হলেও এখনও অনেক এলাকায় মেশিনের ব্যবহার সীমিত।বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এই ধরনের সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব। পাশাপাশি শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ এবং আগাম পরিকল্পনা থাকলে কৃষকেরা এমন বিপাকে পড়বেন না।
সব মিলিয়ে, নিয়ামতপুরের ছাতড়া বিলে ধান কাটার বর্তমান পরিস্থিতি কৃষকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে শ্রমিক সংকট ও বাড়তি মজুরি, অন্যদিকে বাজারে ধানের কম দাম—সবকিছু মিলিয়ে কৃষকের লাভের হিসাব অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। তবে দ্রুত ধান কাটা শেষ করতে পারলে এবং আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই সংকট কিছুটা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।