দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

শেরপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে মে দিবস ২০২৬: “সুখী শ্রমিক, কর্মঠ হাত” স্লোগানে র‍্যালি ও আলোচনা সভা

ইন্ট্রো: “সুখী শ্রমিক, কর্মঠ হাত—আগামী দিনের নব প্রভাত” এই প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে শেরপুরে পালিত হলো মহান মে দিবস ও জাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস ২০২৬। জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আয়োজিত বর্ণাঢ্য র‍্যালি ও আলোচনা সভায় অংশ নেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ, শ্রমিক নেতা ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা।বর্ণাঢ্য র‍্যালিতে শ্রমিকদের অংশগ্রহণশুক্রবার (১ মে) সকালে শেরপুর জেলা প্রশাসনের আয়োজনে শহরের গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোতে একটি বর্ণাঢ্য র‍্যালি বের করা হয়। র‍্যালিতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী, শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মী, শিক্ষার্থী ও সাধারণ মানুষ অংশগ্রহণ করেন। ব্যানার, ফেস্টুন ও নানা স্লোগানে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো শহর।র‍্যালিটি শহরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় প্রাঙ্গণে এসে শেষ হয়। অংশগ্রহণকারীদের হাতে ছিল শ্রমিক অধিকার, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং ন্যায্য মজুরির দাবিতে বিভিন্ন বার্তাসংবলিত প্ল্যাকার্ড।আলোচনা সভায় শ্রমিক অধিকার নিয়ে গুরুত্বারোপর‍্যালি শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন শেরপুরের জেলা প্রশাসক (রুটিন দায়িত্ব) মিজ্ আরিফা সিদ্দিকা। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং শ্রম বিষয়ক সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিরা।সভায় বক্তারা বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে শ্রমিকদের অবদান অপরিসীম। শিল্প, কৃষি, নির্মাণসহ সব খাতেই শ্রমিকদের কঠোর পরিশ্রম দেশের অগ্রগতির মূল চালিকাশক্তি। কিন্তু এখনও অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ন্যায্য অধিকার, স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত হয়নি—যা উদ্বেগজনক।একজন বক্তা বলেন, “শ্রমিকদের শুধু উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবে না। তাদের মানবিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।”পেশাগত স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতার আহ্বানজাতীয় পেশাগত স্বাস্থ্য ও সেইফটি দিবস উপলক্ষে আলোচনায় বিশেষভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি। বক্তারা বলেন, অনেক সময় কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায় দুর্ঘটনা ঘটে, যা শ্রমিকদের জীবন ও জীবিকাকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলে।সভায় উপস্থিত কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর, জামালপুরের প্রতিনিধিরা জানান, তারা নিয়মিতভাবে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিদর্শন কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তবে আরও কার্যকর মনিটরিং ও সচেতনতা বৃদ্ধির প্রয়োজন রয়েছে।স্থানীয়দের মতামতঅনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া এক শ্রমিক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন, “মে দিবসে আমরা অনেক কথা শুনি, কিন্তু বাস্তবে অনেক জায়গায় এখনও শ্রমিকদের অধিকার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়নি। বিশেষ করে নিরাপদ কর্মপরিবেশ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।”অন্যদিকে একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী বলেন, “শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু মানবিক দায়িত্ব নয়, এটি ব্যবসার জন্যও জরুরি। নিরাপদ কর্মপরিবেশ উৎপাদনশীলতা বাড়ায়।”শ্রমিক কল্যাণে প্রশাসনের ভূমিকাসভায় জেলা প্রশাসক মিজ্ আরিফা সিদ্দিকা বলেন, শ্রমিকদের কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রশাসন সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে।তিনি আরও বলেন, “শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের সম্মিলিত দায়িত্ব। এ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ, শ্রমিক এবং প্রশাসনের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।”বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ: কী বলছে বিশ্লেষণবিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে শ্রমিকদের জন্য আইনগত কাঠামো থাকলেও এর সঠিক প্রয়োগ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক ক্ষেত্রে শ্রমিকরা তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন নন, আবার কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ রয়েছে যে নিয়মকানুন পুরোপুরি মানা হয় না।এ বিষয়ে এক শ্রম বিশ্লেষক জানান, “শ্রমিকদের জন্য নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু আইন থাকলেই হবে না, তার কার্যকর প্রয়োগ এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত করতে হবে।”অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়াকিছু শ্রমিকের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেই এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিষয়টি উপেক্ষিত হয়। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।সামনে করণীয়বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে— নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন শ্রমিকদের সচেতনতা বৃদ্ধি স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা প্রশিক্ষণ জোরদার করা এছাড়া মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বাড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।উপসংহারমে দিবস কেবল একটি প্রতীকী দিন নয়, এটি শ্রমিকদের অধিকার ও মর্যাদার সংগ্রামের ইতিহাস বহন করে। শেরপুরে আয়োজিত এই কর্মসূচি সেই বার্তাকেই নতুন করে স্মরণ করিয়ে দিল। “সুখী শ্রমিক, কর্মঠ হাত”—এই স্লোগান বাস্তবে রূপ দিতে হলে শুধু একদিনের আয়োজন নয়, প্রয়োজন সারা বছরের পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ। শ্রমিকদের নিরাপত্তা, অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত হলেই গড়ে উঠবে একটি টেকসই ও মানবিক সমাজ।

শেরপুরে বর্ণাঢ্য আয়োজনে মে দিবস ২০২৬: “সুখী শ্রমিক, কর্মঠ হাত” স্লোগানে র‍্যালি ও আলোচনা সভা