দেশে ভয়াবহ হামের প্রাদুর্ভাব, টিকা সংকটে বাড়ছে মৃত্যুর সংখ্যা
দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ এখন উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭ জনের মৃত্যু হওয়ায় মোট মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১৯৮ জনে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ছোট শিশুরা, যাদের বড় অংশই টিকা পায়নি বা আংশিক টিকা নিয়েছে।স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ইতোমধ্যে ৫৮ জেলায় হামের সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে। অর্থাৎ প্রায় ৯১ শতাংশ জেলা এখন এই রোগের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষ করে ঢাকা বিভাগের কিছু এলাকা—ডেমরা, যাত্রাবাড়ী, কামরাঙ্গীরচর, কড়াইল, মিরপুর ও তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল—সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ টিকাদানের ঘাটতি। ২০২৪-২৫ সময়ে হাম-রুবেলা (এমআর) টিকার সংকট এবং সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে অনেক শিশু নির্ধারিত সময়মতো টিকা পায়নি। ফলে তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সংক্রমণের ঝুঁকি বেড়েছে।সাম্প্রতিক তথ্য বলছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে হামের রোগী অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে শুরু করে। মার্চের মাঝামাঝি থেকে এপ্রিলের মাঝামাঝি পর্যন্ত প্রায় ১৯ হাজারের বেশি সন্দেহভাজন রোগী শনাক্ত হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে প্রায় ৩ হাজারের মতো রোগী নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সময়ে ১৬৬ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং বর্তমানে ১২ হাজারের বেশি রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।এই প্রাদুর্ভাবে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হচ্ছে পাঁচ বছরের কম বয়সি শিশুরা। মোট আক্রান্তদের মধ্যে ৭৯ শতাংশই এই বয়সসীমার। এর মধ্যে অনেক শিশুর বয়স ২ বছরেরও কম, এমনকি ৯ মাসের নিচের শিশুও রয়েছে। এদের অনেকেই এখনো টিকা নেওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মৃত শিশুদের বেশিরভাগই ছিল টিকাবঞ্চিত বা মাত্র এক ডোজ টিকা নেওয়া। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এটি স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে টিকাদান কর্মসূচিতে বড় ধরনের ঘাটতি ছিল। একই সঙ্গে অপুষ্টি ও ভিটামিন এ-এর অভাবও শিশুদের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এতে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া, এমনকি মস্তিষ্কে প্রদাহের মতো জটিলতা দেখা দিচ্ছে।হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা বাতাসের মাধ্যমে দ্রুত ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির কাশি বা হাঁচির মাধ্যমে ভাইরাস সহজেই অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। সাধারণত সংক্রমণের ১০ থেকে ১৪ দিনের মধ্যে জ্বর, কাশি, চোখ লাল হওয়া এবং পরে শরীরে ফুসকুড়ি দেখা দেয়। রোগী ফুসকুড়ি ওঠার কয়েক দিন আগে এবং পরে অন্যদের সংক্রমিত করতে পারে।বিশ্বব্যাপী হামের ইতিহাস বলছে, এটি একসময় শিশু মৃত্যুর বড় কারণ ছিল। তবে টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে অনেক দেশ এই রোগ নিয়ন্ত্রণে এনেছে। বাংলাদেশও একসময় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছিল। ২০০০ সালে যেখানে টিকার কভারেজ ছিল ৮৯ শতাংশ, পরে তা ১০০ শতাংশেরও বেশি ছাড়িয়ে যায়। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই সাফল্যে ভাটা পড়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত টিকাদান কর্মসূচি বন্ধ থাকা এবং সম্পূরক টিকাদান (এসআইএ) না হওয়ায় ঝুঁকি ধীরে ধীরে বেড়েছে। ফলে এখন বড় পরিসরে সংক্রমণ দেখা দিচ্ছে।জনস্বাস্থ্যবিদদের মতে, পরিস্থিতি সামাল দিতে দ্রুত জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে সারাদেশে টিকাদান জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ ক্যাম্পেইন চালানো এবং শিশুদের পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি।
সবশেষে বলা যায়, হামের এই পরিস্থিতি শুধু একটি স্বাস্থ্য সংকট নয়, এটি আমাদের টিকাদান ব্যবস্থার দুর্বলতাও সামনে নিয়ে এসেছে। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই এখনই সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়াই একমাত্র পথ।