ক্ষতিতেও ১% টার্নওভার কর: ছোট উদ্যোক্তাদের চাপ, রপ্তানিতে অর্ডার কমার শঙ্কা
লাভ হোক বা ক্ষতি—তার পরও ন্যূনতম ১ শতাংশ টার্নওভার কর দিতে হওয়ায় দেশের ছোট উদ্যোক্তারা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে বৈশ্বিক অস্থিরতা ও জ্বালানিশঙ্কার কারণে বিদেশি ক্রেতারা নতুন অর্ডার কমিয়ে দিচ্ছেন বলেও উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা।রাজধানীর আগারগাঁওয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সম্মেলনকক্ষে ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রাক-বাজেট আলোচনায় এসব বিষয় উঠে আসে।“ক্ষতিতেও কর—ছোট ব্যবসার জন্য বড় চাপ”আলোচনায় বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল-আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, বর্তমান ব্যবস্থায় ব্যবসা লাভে থাকুক বা ক্ষতিতে থাকুক—টার্নওভারের ওপর ১ শতাংশ কর দিতে হয়। এটি অনেক ছোট উদ্যোক্তার জন্য অসহনীয় চাপ তৈরি করছে।তার মতে, অনেক ব্যবসা এমন পরিস্থিতিতে রয়েছে যেখানে আয় না থাকলেও কর দিতে হচ্ছে, যা ব্যবসা টিকিয়ে রাখাকে কঠিন করে তুলছে।তিনি ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য আলাদা কর স্ল্যাব চালুর প্রস্তাব দেন, যাতে তারা কিছুটা স্বস্তি পান এবং ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে পারেন।[TECHTARANGA-POST:1064]বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এনবিআর চেয়ারম্যানবৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খানসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তারা ব্যবসা পরিবেশ, কর কাঠামো এবং বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে মতামত তুলে ধরেন।রপ্তানি খাতে অর্ডার কমার শঙ্কাআলোচনায় বিসিআই সভাপতি আরও সতর্ক করে বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সম্ভাব্য জ্বালানিসংকট নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে অনেক ক্রেতা বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দিতে দ্বিধা করছেন।বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে জুলাই–আগস্ট মাসে যে পরিমাণ অর্ডার আসার কথা ছিল, তার বড় অংশ ধীর হয়ে গেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।তার মতে, পরিস্থিতি চলমান থাকলে দেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের খাত ঝুঁকিতে পড়তে পারে।রপ্তানি উৎস কর কমানোর দাবি, এনবিআরের অবস্থানব্যবসায়ীরা রপ্তানি আয়ের ওপর ১ শতাংশ উৎস কর কমিয়ে ০.৫ শতাংশ করার প্রস্তাব দেন। তবে এনবিআর চেয়ারম্যান স্পষ্টভাবে জানান, বর্তমানে করপোরেট করহার কমানোর সুযোগ নেই।তিনি বলেন, রাজস্ব বাড়ানোর জন্য কর ফাঁকি রোধ ও কর ব্যবস্থার আওতা বাড়ানো হবে। যারা কর দিচ্ছেন না, তাদেরও করের আওতায় আনা হবে।[TECHTARANGA-POST:1059]ঢাকা চেম্বারের ৫৪টি প্রস্তাবপ্রাক-বাজেট আলোচনায় ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পক্ষ থেকে মোট ৫৪টি প্রস্তাব তুলে ধরা হয়।এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—
অতালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার ২৭.৫% থেকে ২৫% করা
ব্যক্তিশ্রেণির করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা নির্ধারণ
বাণিজ্যিক আমদানিতে অগ্রিম কর ৭.৫% থেকে ৫% করা
কাস্টমস রিফান্ড ব্যবস্থার পূর্ণ অটোমেশন
ব্যবসায়ী নেতাদের মতে, এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়ন হলে ব্যবসার খরচ কমবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে।এনবিআরের কৌশল: শুল্ক নয়, বাধা কমানোএনবিআর চেয়ারম্যান জানান, চলতি বাজেটে শুল্কহার কমানোর চেয়ে নন-ট্যারিফ বাধা কমানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে।তিনি বলেন, কর ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা এবং কর ফাঁকি কমানোই এখন প্রধান লক্ষ্য।অন্যান্য খাতের প্রস্তাবও উঠে আসেআলোচনায় এলপিজি অটোগ্যাস স্টেশন মালিকরা কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক কমানো, এলপিজিতে ভ্যাট অব্যাহতি এবং ট্যাক্স হলিডে সুবিধা চেয়েছেন।অন্যদিকে ফার্নিচার শিল্প সমিতি কাঁচামাল ক্রয়ে উৎস কর ৩ শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫০ শতাংশ করার দাবি জানিয়েছে।অর্থনীতিতে দুই অবস্থানের টানাপোড়েনবিশ্লেষকদের মতে, প্রাক-বাজেট আলোচনায় স্পষ্ট হয়েছে একটি বাস্তব দ্বন্দ্ব—ব্যবসায়ীরা করের চাপ কমাতে চান, আর সরকার রাজস্ব বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।এই দুই অবস্থানের মধ্যে ভারসাম্য আনতে পারলে একদিকে উদ্যোক্তারা স্বস্তি পাবেন, অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাও শক্তিশালী হবে।শেষ কথাক্ষতিতে থেকেও টার্নওভার কর, রপ্তানি অর্ডার কমার শঙ্কা এবং বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে ব্যবসা খাতে চাপের বার্তা দিচ্ছে এবারের প্রাক-বাজেট আলোচনা।
আগামী বাজেটে এসব দাবি কতটা প্রতিফলিত হয়, এখন সেটিই দেখার অপেক্ষায় ব্যবসায়ী মহল।[TECHTARANGA-POST:1070]