দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

ডিমের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী, চাপে নিম্ন আয়ের পরিবার; বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন বিতর্ক

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় আবারও বাড়তে শুরু করেছে ডিমের দাম। মাত্র দুই সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ডজনে ২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে খামারের ডিমের দাম। এক মাসের ব্যবধানে সেই বৃদ্ধি পৌঁছেছে প্রায় ৪০ টাকায়। ফলে কম আয়ের মানুষের নিত্য খাদ্যতালিকায় থাকা ডিম এখন অনেকের নাগালের বাইরে যেতে বসেছে। বাজারে দাম বাড়ার কারণ নিয়ে খুচরা বিক্রেতা, পাইকার ও খামারিদের মধ্যে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ।শনিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাদামি রঙের ফার্মের ডিম প্রতি ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায়। সাদা ডিমের দাম কিছুটা কম হলেও সেটিও সাধারণ মানুষের জন্য বাড়তি চাপ তৈরি করছে। ছোট বাজার ও মহল্লাভিত্তিক দোকানগুলোতে চারটি ডিমের এক হালি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায়, যা হিসাব করলে প্রতি ডজন দাঁড়ায় ১৫০ টাকা।এক মাসে বড় উল্লম্ফনরমজানের সময় ডিমের চাহিদা কম থাকায় দাম কিছুটা নেমে গিয়েছিল। তখন অনেক এলাকায় প্রতি ডজন ডিম ৯৫ থেকে ১১০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়। তবে ঈদের পর ধীরে ধীরে বাজার ঘুরে দাঁড়ায়। প্রায় ২০ দিন আগেও যেখানে ডজনপ্রতি দাম ছিল ১২৫ টাকার আশপাশে, এখন সেটি বেড়ে ১৪০-১৫০ টাকায় পৌঁছেছে।[TECHTARANGA-POST:1158]সরকারি সংস্থা ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) তথ্যেও মূল্যবৃদ্ধির এই চিত্র উঠে এসেছে। সংস্থাটির হিসাবে, গত এক মাসে ডিমের দাম বেড়েছে প্রায় ২২ শতাংশ। আর এক বছরের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ।বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির পর পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। সেই প্রভাব ধীরে ধীরে নিত্যপণ্যের বাজারে পড়ছে। ডিমও এখন সেই চাপের বাইরে নেই।“মাছ-গোশত কিনতে পারি না, ডিমও এখন কষ্টের”রাজধানীর কারওয়ান বাজারে ডিম কিনতে আসা অটোরিকশাচালক শামছুল আলম বলেন, কয়েক দিন আগেও তিনি ১৩০ টাকায় এক ডজন ডিম কিনেছিলেন। এখন একই ডিম কিনতে হয়েছে ১৪০ টাকায়।তিনি বলেন, “মাছ-মাংসের দাম তো আগেই বেশি ছিল। তাই ডিম দিয়েই কোনোভাবে সংসার চালাতাম। এখন ডিমের দামও বাড়ছে। গরিব মানুষ যাবে কোথায়?”শামছুল আলমের মতো অনেক নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবার এখন খাদ্য খরচ সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছে। বাজারে সবজির পাশাপাশি মাছ, মাংস ও দুধজাত পণ্যের দাম আগে থেকেই চড়া। ফলে ডিম ছিল তুলনামূলক সাশ্রয়ী প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম উৎস। সেই ডিমের দাম বাড়ায় পুষ্টি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।খুচরা ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পাইকারিতে বাড়ছে দামকারওয়ান বাজারের ডিম বিক্রেতা জাহাঙ্গীর আলম বলেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ার কারণে খুচরা পর্যায়ে বাড়তি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। তাঁর দাবি, কয়েক সপ্তাহ ধরে বাজারে ডিমের সরবরাহ কিছুটা কমেছে।তিনি জানান, “আগে যেসব খামার থেকে বেশি ডিম আসত, এখন সেখান থেকে সরবরাহ কম। পাইকারি বাজারে বেশি দামে কিনে এনে কম দামে বিক্রি করা সম্ভব না।”ব্যবসায়ীদের একটি অংশের দাবি, গত মাসে মুরগির দাম বাড়ায় অনেক খামারি ডিমপাড়া মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। এতে ডিম উৎপাদনে প্রভাব পড়েছে।[TECHTARANGA-POST:1140]বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পুরোনো বিতর্ক আবার সামনেডিমের বাজারে অস্থিরতা বাড়তেই আবারও সামনে এসেছে বাজার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ। প্রান্তিক খামারিদের দাবি, উৎপাদন তারা করলেও দাম ঠিক করেন বড় আড়তদার ও ব্যবসায়ী গোষ্ঠী।বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি সুমন হাওলাদার অভিযোগ করেন, ঢাকার কিছু বড় ব্যবসায়ী দীর্ঘদিন ধরে বাজারে প্রভাব বিস্তার করছেন। তাঁর দাবি, উৎপাদন পর্যায়ে দাম কম থাকলেও ভোক্তা পর্যায়ে সেটি অনেক বেশি দামে বিক্রি হয়।তিনি বলেন, “খামারিরা ন্যায্য দাম পান না। আবার ভোক্তারাও বেশি দামে কিনছেন। মাঝখানে লাভ করছে মধ্যস্বত্বভোগীরা।”তাঁর আরও দাবি, ডিম হিমাগারে সংরক্ষণ করে পরে বেশি দামে বাজারে ছাড়ার প্রবণতা রয়েছে। এতে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হতে পারে বলে অভিযোগ উঠেছে।তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন তেজগাঁওয়ের পাইকারি ব্যবসায়ীরা। ডিম ব্যবসায়ী সমিতির সাবেক সভাপতি আমানত উল্লাহ বলেন, দেশের বিভিন্ন এলাকায় লাখ লাখ ডিম উৎপাদন ও বিক্রি হয়। শুধু ঢাকার কোনো একটি বাজার থেকে পুরো দেশের দাম নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়।তাঁর ভাষ্য, “খামারিরা যখন লোকসানে ছিলেন, তখন কেউ কথা বলেনি। এখন উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাজারে প্রভাব পড়েছে।”গরম, ভাইরাস ও চাহিদা—সব মিলিয়ে চাপব্যবসায়ী ও খামারিদের একটি অংশ বলছেন, সাম্প্রতিক গরম আবহাওয়া এবং ভাইরাসজনিত কারণে অনেক খামারে মুরগি মারা গেছে। এতে উৎপাদন কমেছে। পাশাপাশি কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠয়ে শিক্ষার্থীদের টিফিনে ডিম যুক্ত হওয়ায় চাহিদাও বেড়েছে।তবে বাজার সংশ্লিষ্টদের অনেকে মনে করছেন, শুধু উৎপাদন ঘাটতি দিয়ে বর্তমান মূল্যবৃদ্ধিকে ব্যাখ্যা করা কঠিন। কারণ উৎপাদন পর্যায়ে দাম যতটা বাড়ছে, খুচরা বাজারে তার চেয়ে অনেক বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে।ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর ভাষ্য, সরবরাহ ব্যবস্থায় একাধিক স্তরের মধ্যস্বত্বভোগী থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণ কঠিন হয়ে পড়ছে। এর ফলে উৎপাদক ও ভোক্তা—দুই পক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তনের ঝুঁকিঅর্থনীতিবিদ ও পুষ্টিবিষয়ক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে খাদ্য মূল্যস্ফীতির চাপ সাধারণ মানুষের খাদ্যাভ্যাসে বড় পরিবর্তন আনছে। অনেক পরিবার ইতোমধ্যে মাছ ও মাংসের পরিমাণ কমিয়ে দিয়েছে। ডিম ছিল তুলনামূলক সহজলভ্য একটি বিকল্প। এখন সেটির দামও বাড়তে থাকায় শিশু ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোর পুষ্টিহীনতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এস এম নাজের হোসাইন বলেন, বাজারে কার্যকর নজরদারির অভাব এবং উৎপাদন থেকে খুচরা পর্যায় পর্যন্ত সমন্বয়ের ঘাটতির কারণে বারবার এমন পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1139]তিনি মনে করেন, শুধু অভিযান চালিয়ে সাময়িকভাবে দাম কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল বাজার নিশ্চিত করতে হলে উৎপাদন ব্যয় কমানো, আমদানিনির্ভর কাঁচামালের বিকল্প খোঁজা এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা আনা জরুরি।সামনে কী হতে পারেবাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, উৎপাদন স্বাভাবিক না হলে এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় কার্যকর নজরদারি না বাড়লে ডিমের বাজার আরও অস্থির হতে পারে। ভোক্তাদের অভিযোগ, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের বাজারে ঘন ঘন অস্থিরতা এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। সরকারি সংস্থাগুলোর নজরদারি বাড়ানো, সম্ভাব্য মজুতদারি তদন্ত এবং উৎপাদক পর্যায়ে সহায়তা জোরদারের দাবি উঠছে বিভিন্ন মহল থেকে। তবে বাজারে দ্রুত স্বস্তি ফিরবে কি না, সেটি নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা রয়ে গেছে।

ডিমের দাম আবার ঊর্ধ্বমুখী, চাপে নিম্ন আয়ের পরিবার; বাজার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নতুন বিতর্ক