প্রেম থেকে ট্র্যাজেডি: যুক্তরাষ্ট্রে লিমন ও বৃষ্টির মৃত্যুর ঘটনায় গ্রেপ্তার এক
যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ হওয়া দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থী জামিল আহমেদ লিমন ও নাহিদা সুলতানা বৃষ্টির মৃত্যুর খবর পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজকে নাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় ১০ দিন নিখোঁজ থাকার পর একদিনের ব্যবধানে তাদের দুজনেরই মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়, যা ঘিরে তৈরি হয়েছে গভীর শোক আর নানা প্রশ্ন।
জামিল আহমেদ লিমন (২৭) ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় ভূগোল, পরিবেশবিজ্ঞান ও নীতি বিষয়ে পিএইচডি করছিলেন। অন্যদিকে নাহিদা সুলতানা বৃষ্টি একই বিশ্ববিদ্যালয়ে কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিষয়ে পিএইচডি করতেন। তারা দুজনই মেধাবী শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় পরিকল্পনা ছিল তাদের।
পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, লিমন ও বৃষ্টির মধ্যে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল এবং তারা শিগগিরই বিয়ের পরিকল্পনা করছিলেন। লিমনের ভাই জুবায়ের আহমেদ জানান, লিমন প্রায়ই পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সময় বৃষ্টির প্রশংসা করতেন। তিনি বলতেন, বৃষ্টি খুব ভালো মনের মানুষ, প্রতিভাবান এবং গান ও রান্নায় দক্ষ।
লিমন সম্পর্কে তার পরিবারের সদস্যরা জানান, তিনি খুবই সাধারণ ও ভদ্র স্বভাবের ছিলেন। সবসময় হাসিখুশি থাকা এই তরুণ দীর্ঘদিন ধরে নিজের পিএইচডি থিসিস নিয়ে কঠোর পরিশ্রম করছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল ডিগ্রি শেষ করে দেশে ফিরে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করা।
ঘটনার সূত্রপাত হয় গত ১৬ এপ্রিল। সেদিন সকালে টাম্পায় সর্বশেষ লিমনকে তার ছাত্রাবাসে এবং বৃষ্টিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভবনে দেখা যায়। এরপর থেকে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার চেষ্টা করেও কোনো সাড়া না পেয়ে এক পারিবারিক বন্ধু বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জানান।
এরপর শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। প্রায় ১০ দিন পর শুক্রবার লিমনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই দিনে নিখোঁজ থাকা বৃষ্টির মৃত্যুর খবরও পরদিন নিশ্চিত করে স্থানীয় পুলিশ। এই ঘটনায় হিশাম আবুঘরবেহ (২৬) নামের এক মার্কিন নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে, যিনি লিমনের সঙ্গে একই কক্ষে থাকতেন। তবে ঠিক কী কারণে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে, সে বিষয়ে এখনো বিস্তারিত কিছু জানায়নি পুলিশ।
বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল হলেও যুক্তরাষ্ট্রে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিয়ে মাঝেমধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা নতুন পরিবেশে থাকায় অনেক সময় ঝুঁকিতে পড়তে পারেন। ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডা একটি বড় গবেষণা প্রতিষ্ঠান, যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে হাজারো শিক্ষার্থী পড়াশোনা করতে আসে।
এ ধরনের ঘটনায় সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ও স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে তদন্ত চালায়। যুক্তরাষ্ট্রে ক্যাম্পাস নিরাপত্তা জোরদার করার জন্য আলাদা পুলিশ ইউনিট থাকে, যারা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করে। তারপরও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনায় প্রশ্ন উঠে আসে নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে।
লিমন ও বৃষ্টির মৃত্যু শুধু দুইটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটির জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তাদের স্বপ্ন, ভালোবাসা আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা একসঙ্গে থেমে গেল এই মর্মান্তিক ঘটনায়। তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত কারণ দ্রুত বেরিয়ে আসবে—এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
সবশেষে বলা যায়, এই ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, বিদেশে উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি ব্যক্তিগত নিরাপত্তাও কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে প্রিয়জন হারানোর এই বেদনাদায়ক অধ্যায় দুই পরিবারের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী ছাপ রেখে যাবে।