ইরানে গোপন হামলায় সৌদি আরবও জড়িত? মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে নতুন তথ্য সামনে
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিয়ে নতুন এক তথ্য সামনে এসেছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যুদ্ধ চলাকালে সৌদি আরব নিজেদের ভূখণ্ডে হওয়া হামলার জবাবে ইরানের ভেতরে গোপনে একাধিক সামরিক অভিযান চালিয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে আগে কখনও আলোচনা হয়নি। ফলে প্রথমবারের মতো এমন ইঙ্গিত মিলল যে, রিয়াদ সরাসরি ইরানের মাটিতে সামরিক পদক্ষেপ নিয়েছিল।রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, দুই পশ্চিমা কর্মকর্তা ও দুই ইরানি কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে এই তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও হামলার নির্দিষ্ট স্থান বা লক্ষ্যবস্তু স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি সংবাদমাধ্যমটি। সৌদি সরকারও সরাসরি হামলার বিষয়টি স্বীকার বা অস্বীকার করেনি।মার্চের শেষ দিকে হামলার অভিযোগপশ্চিমা কর্মকর্তাদের একজনের ভাষ্য অনুযায়ী, গত মার্চের শেষ দিকে সৌদি বিমানবাহিনী এসব হামলা চালিয়ে থাকতে পারে। তিনি এটিকে “সমানুপাতিক প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ” হিসেবে বর্ণনা করেছেন। দাবি করা হচ্ছে, সৌদি আরবের ভেতরে ইরানি হামলার জবাব হিসেবেই এই অভিযান পরিচালিত হয়।[TECHTARANGA-POST:1242]যদিও সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে সরাসরি দায় স্বীকার করেননি। অন্যদিকে, ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।বিশ্লেষকদের মতে, এতদিন সৌদি আরব প্রকাশ্যে ইরানের বিরুদ্ধে সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ এড়িয়ে চললেও সাম্প্রতিক সংঘাত পরিস্থিতি সেই অবস্থান বদলে দিয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নেতৃত্বে ইরানের ওপর হামলার পর উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে।উপসাগরীয় অঞ্চজুড়ে উত্তেজনাগত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে যে সংঘাতের সূচনা হয়, তা অল্প সময়ের মধ্যেই পুরো মধ্যপ্রাচ্যে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর ইরান মিসাইল ও ড্রোন হামলার মাধ্যমে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের (জিসিসি) সদস্য দেশগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাতে শুরু করে বলে অভিযোগ ওঠে।প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্য ছিল শুধু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নয়; বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার এবং বেসামরিক স্থাপনাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালীতে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও বাণিজ্যেও চাপ তৈরি হয়।এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল এক প্রতিবেদনে দাবি করেছিল, সংযুক্ত আরব আমিরাতও ইরানের ভেতরে গোপন সামরিক অভিযান চালিয়েছে। এখন সৌদি আরবের নাম সামনে আসায় স্পষ্ট হচ্ছে, উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ সরাসরি সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে—যদিও প্রকাশ্যে তা স্বীকার করা হয়নি।সৌদি আরব ও আমিরাতের অবস্থানে পার্থক্যসংঘাতের বিষয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর অবস্থান এক নয় বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তুলনামূলকভাবে কঠোর অবস্থান নিয়েছে এবং ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর কৌশল নিয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।[TECHTARANGA-POST:1234]অন্যদিকে সৌদি আরব একদিকে পাল্টা হামলা চালালেও অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগ চালিয়ে গেছে। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদে নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।সৌদি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওই কর্মকর্তা বলেছেন, রিয়াদ সবসময় আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উত্তেজনা কমানোর পক্ষে। তিনি বলেন, “এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে ধৈর্য ও সংযম প্রয়োজন।”হামলার পর শুরু হয় কূটনৈতিক যোগাযোগইরানি ও পশ্চিমা কর্মকর্তাদের দাবি, সৌদি আরব গোপন হামলার পর তেহরানকে বিষয়টি জানায়। এরপর দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ে এবং আরও বড় সংঘাত এড়াতে অনানুষ্ঠানিক সমঝোতার পথে এগোয় উভয় পক্ষ।থিংক ট্যাংক ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রজেক্ট ডিরেক্টর আলী ভায়েজ বলেন, এই ঘটনাগুলো দেখিয়েছে যে উভয় দেশই বুঝতে পেরেছে নিয়ন্ত্রণহীন সংঘাত ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।তার ভাষায়, “বিশ্বাস না থাকলেও এখানে একটি অভিন্ন স্বার্থ কাজ করছে—সংঘাতকে এমন পর্যায়ে যেতে না দেওয়া, যেখান থেকে পুরো অঞ্চল যুদ্ধের মধ্যে ডুবে যাবে।”যুদ্ধবিরতির আগেই অনানুষ্ঠানিক সমঝোতারয়টার্সের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৭ এপ্রিল যে বৃহত্তর যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, তারও আগে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের একটি অনানুষ্ঠানিক বোঝাপড়া তৈরি হয়েছিল।এক ইরানি কর্মকর্তা বলেছেন, এই সমঝোতার উদ্দেশ্য ছিল “শত্রুতা কমানো, পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা করা এবং সংঘাতের বিস্তার ঠেকানো।”হোয়াইট হাউস অবশ্য এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেনি।দীর্ঘ বৈরিতার পেছনের ইতিহাসমধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বহু বছর ধরেই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে ইরান ও সৌদি আরব। শিয়া নেতৃত্বাধীন শক্তি হিসেবে ইরান এবং সুন্নি নেতৃত্বাধীন শক্তি হিসেবে সৌদি আরব আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জড়িত।তবে ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় দুই দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। সেই প্রক্রিয়ার পর ইয়েমেনেও তুলনামূলক স্থিতিশীলতা ফিরে আসে। বিশেষ করে ইরান-সমর্থিত হুতি গোষ্ঠী এবং সৌদি আরবের মধ্যে সংঘর্ষ অনেকটাই কমে যায়।[TECHTARANGA-POST:1223]বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক এই গোপন হামলার খবর সেই সম্পর্কের ভঙ্গুর বাস্তবতাকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে।আঞ্চলিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক প্রভাবমধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত শুধু সামরিক বা রাজনৈতিক সংকট নয়, এটি বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি জড়িত। হরমুজ প্রণালী দিয়ে বিশ্বের বড় অংশের তেল পরিবহন হয়। ফলে সেখানে অস্থিরতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়লে বিদেশি বিনিয়োগ, বাণিজ্য ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপরও চাপ পড়ে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলা চলতে থাকলে পুরো অঞ্চলে নতুন নিরাপত্তা সংকট তৈরি হতে পারে।এখন কী পরিস্থিতি?বর্তমানে ইরান ও সৌদি আরব প্রকাশ্যে সংঘাতে জড়ানোর পথ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলোর দাবি। তবে গোপন সামরিক তৎপরতার খবর সামনে আসায় মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকলেও পারস্পরিক অবিশ্বাস এখনো কাটেনি। ফলে ছোট কোনো ঘটনাও আবার বড় সংঘাতের দিকে পরিস্থিতিকে ঠেলে দিতে পারে।