মাদারীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের নতুন ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি আর ১০টি আইসিইউ—সবই আছে, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত জনবল। ফলে ২০২৩ সালে উদ্বোধনের পরও কার্যত অচল পড়ে আছে হাসপাতালটির গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো। আইসিইউ, সিটিস্ক্যান, ডিজিটাল এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রামের মতো জরুরি সেবাও মিলছে না, ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা।
মাদারীপুর জেলা হাসপাতালটি ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয় ২০১৯ সালে। পরে ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবন ও অবকাঠামো উদ্বোধন করা হয়।
এরপর আলাদাভাবে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আইসিইউসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। একই বছরের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ বেডের আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধনও করা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—উদ্বোধনের পর থেকেই অধিকাংশ সেবা বন্ধ বা সীমিত অবস্থায় পড়ে আছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ১০ শয্যার আইসিইউ থাকলেও প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স ও টেকনিক্যাল স্টাফ না থাকায় সেটি নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না।
ফলে গুরুতর রোগীদের এখনো ঢাকা বা ফরিদপুরের মতো দূরবর্তী হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। এতে সময়, খরচ এবং ঝুঁকি—সবই বাড়ছে।
স্থানীয় রোগীরা বলছেন, জরুরি মুহূর্তে জেলা হাসপাতালে আইসিইউ সেবা না পাওয়া তাদের জন্য বড় হতাশার বিষয়।
শুধু আইসিইউ নয়, হাসপাতালের সিটিস্ক্যান, ডিজিটাল এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনও জনবলের অভাবে নিয়মিত চালু রাখা যাচ্ছে না।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এগুলোর মানও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মেশিন আছে, কিন্তু চালানোর লোক নেই। অনেক সময় এক্স-রে মেশিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ পড়ে থাকে।”
মাদারীপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে মোট ১৯৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩৮ জন। শূন্য রয়েছে ৫৯টি পদ।
এর মধ্যে:
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—চিকিৎসক পদেই সবচেয়ে বেশি ঘাটতি, যা সরাসরি রোগীসেবাকে প্রভাবিত করছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, আধুনিক সুবিধা থাকলেও বাস্তবে সেবা মিলছে না।
লাবনী বেগম নামে এক রোগী স্বজন বলেন,
“আইসিইউ আছে শুনে আশায় এসেছিলাম, কিন্তু এখানে সেবা নেই। বাধ্য হয়ে ঢাকায় যেতে হচ্ছে। গরিব মানুষের জন্য এটা অনেক কষ্টের।”
স্থানীয়রা বলছেন, জরুরি চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ ও সময় নষ্ট হচ্ছে, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু জেলা হাসপাতাল নয়, মাদারীপুরের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই সমস্যা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে জেলার ডাসার উপজেলায় এখনো কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই গড়ে ওঠেনি, যা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করছে।
স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন “নিরাপদ চিকিৎসা চাই”-এর মাদারীপুর সভাপতি মশিউর রহমান পারভেজ বলেন,
“কোটি কোটি টাকা খরচ করে যন্ত্রপাতি আনা হলেও জনবল না থাকায় সেগুলো কাজে লাগছে না। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, রোগীদের প্রতি অবিচার।”
তিনি দ্রুত আইসিইউ চালু এবং স্থায়ী জনবল নিয়োগের দাবি জানান।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন শরিফুল আবেদীন কমল জানান,
“জেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক চিকিৎসক যোগদানের পরও অন্যত্র চলে যান। বিষয়টি আমরা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”
তবে এখনো প্রয়োজনীয় নিয়োগ না হওয়ায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাদারীপুর হাসপাতালের এই পরিস্থিতি শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, বরং দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। অবকাঠামো তৈরি হলেও যদি জনবল ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়, তাহলে কোটি টাকার প্রকল্পও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ। যন্ত্রপাতি যত আধুনিকই হোক, দক্ষ জনবল ছাড়া তা কার্যত অচল।
মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল এখন এক ধরনের বৈপরীত্যের প্রতীক—একদিকে আধুনিক ভবন ও যন্ত্রপাতি, অন্যদিকে জনবল সংকটে ভোগা অচল সেবা ব্যবস্থা।
আইসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো দ্রুত চালু না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। এখন নজর কেবল একটি দিকেই—কবে এই আধুনিক হাসপাতাল সত্যিকার অর্থে রোগীদের সেবা দিতে পারবে।

শনিবার, ০৯ মে ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মে ২০২৬
মাদারীপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেলা হাসপাতালের নতুন ভবন, আধুনিক যন্ত্রপাতি আর ১০টি আইসিইউ—সবই আছে, কিন্তু নেই পর্যাপ্ত জনবল। ফলে ২০২৩ সালে উদ্বোধনের পরও কার্যত অচল পড়ে আছে হাসপাতালটির গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো। আইসিইউ, সিটিস্ক্যান, ডিজিটাল এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রামের মতো জরুরি সেবাও মিলছে না, ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগীরা।
মাদারীপুর জেলা হাসপাতালটি ১০০ শয্যা থেকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয় ২০১৯ সালে। পরে ২০২৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি প্রায় ৩০ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন ভবন ও অবকাঠামো উদ্বোধন করা হয়।
এরপর আলাদাভাবে প্রায় ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে আইসিইউসহ বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়। একই বছরের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে ১০ বেডের আইসিইউ ইউনিট উদ্বোধনও করা হয়।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—উদ্বোধনের পর থেকেই অধিকাংশ সেবা বন্ধ বা সীমিত অবস্থায় পড়ে আছে।
হাসপাতাল সূত্র জানায়, ১০ শয্যার আইসিইউ থাকলেও প্রয়োজনীয় ডাক্তার, নার্স ও টেকনিক্যাল স্টাফ না থাকায় সেটি নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না।
ফলে গুরুতর রোগীদের এখনো ঢাকা বা ফরিদপুরের মতো দূরবর্তী হাসপাতালে নিতে হচ্ছে। এতে সময়, খরচ এবং ঝুঁকি—সবই বাড়ছে।
স্থানীয় রোগীরা বলছেন, জরুরি মুহূর্তে জেলা হাসপাতালে আইসিইউ সেবা না পাওয়া তাদের জন্য বড় হতাশার বিষয়।
শুধু আইসিইউ নয়, হাসপাতালের সিটিস্ক্যান, ডিজিটাল এক্স-রে ও আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিনও জনবলের অভাবে নিয়মিত চালু রাখা যাচ্ছে না।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এগুলোর মানও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
একজন কর্মী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “মেশিন আছে, কিন্তু চালানোর লোক নেই। অনেক সময় এক্স-রে মেশিন সপ্তাহের পর সপ্তাহ বন্ধ পড়ে থাকে।”
মাদারীপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, হাসপাতালে মোট ১৯৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১৩৮ জন। শূন্য রয়েছে ৫৯টি পদ।
এর মধ্যে:
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—চিকিৎসক পদেই সবচেয়ে বেশি ঘাটতি, যা সরাসরি রোগীসেবাকে প্রভাবিত করছে।
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ, আধুনিক সুবিধা থাকলেও বাস্তবে সেবা মিলছে না।
লাবনী বেগম নামে এক রোগী স্বজন বলেন,
“আইসিইউ আছে শুনে আশায় এসেছিলাম, কিন্তু এখানে সেবা নেই। বাধ্য হয়ে ঢাকায় যেতে হচ্ছে। গরিব মানুষের জন্য এটা অনেক কষ্টের।”স্থানীয়রা বলছেন, জরুরি চিকিৎসার জন্য বাইরে যেতে গিয়ে অতিরিক্ত খরচ ও সময় নষ্ট হচ্ছে, যা অনেক পরিবারের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শুধু জেলা হাসপাতাল নয়, মাদারীপুরের বিভিন্ন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই সমস্যা রয়েছে বলে জানা গেছে।
তবে জেলার ডাসার উপজেলায় এখনো কোনো স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সই গড়ে ওঠেনি, যা পুরো স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ভারসাম্যকে আরও দুর্বল করছে।
স্বাস্থ্য অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন “নিরাপদ চিকিৎসা চাই”-এর মাদারীপুর সভাপতি মশিউর রহমান পারভেজ বলেন,
“কোটি কোটি টাকা খরচ করে যন্ত্রপাতি আনা হলেও জনবল না থাকায় সেগুলো কাজে লাগছে না। এটি শুধু অব্যবস্থাপনা নয়, রোগীদের প্রতি অবিচার।”
তিনি দ্রুত আইসিইউ চালু এবং স্থায়ী জনবল নিয়োগের দাবি জানান।
মাদারীপুরের সিভিল সার্জন শরিফুল আবেদীন কমল জানান,
“জেলার হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জনবল সংকট দীর্ঘদিনের। অনেক চিকিৎসক যোগদানের পরও অন্যত্র চলে যান। বিষয়টি আমরা বারবার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি।”
তবে এখনো প্রয়োজনীয় নিয়োগ না হওয়ায় সমস্যার সমাধান হচ্ছে না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
মাদারীপুর হাসপাতালের এই পরিস্থিতি শুধু একটি জেলার সমস্যা নয়, বরং দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের বাস্তব চিত্রও তুলে ধরে। অবকাঠামো তৈরি হলেও যদি জনবল ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত না হয়, তাহলে কোটি টাকার প্রকল্পও কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো মানবসম্পদ। যন্ত্রপাতি যত আধুনিকই হোক, দক্ষ জনবল ছাড়া তা কার্যত অচল।
মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল এখন এক ধরনের বৈপরীত্যের প্রতীক—একদিকে আধুনিক ভবন ও যন্ত্রপাতি, অন্যদিকে জনবল সংকটে ভোগা অচল সেবা ব্যবস্থা।
আইসিইউসহ গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটগুলো দ্রুত চালু না হলে সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের। এখন নজর কেবল একটি দিকেই—কবে এই আধুনিক হাসপাতাল সত্যিকার অর্থে রোগীদের সেবা দিতে পারবে।

আপনার মতামত লিখুন