দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

জাতীয়

ফ্লোরিডায় রহস্যজনক জোড়া মৃত্যু: বৃষ্টির মরদেহ শনাক্ত, লিমনের লাশ দেশে আসছে ৪ মে

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লোরিডায় নিখোঁজ দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর ঘটনায় নতুন মোড় নিয়েছে তদন্ত। উদ্ধার হওয়া দ্বিতীয় মরদেহটি নাহিদা বৃষ্টির—এ তথ্য নিশ্চিত করেছে স্থানীয় পুলিশ। অন্যদিকে, জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ দেশে আনার প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এই ঘটনায় পরিবার, প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটি এবং দেশের মানুষ গভীর শোক ও উদ্বেগে রয়েছে। বৃষ্টির মরদেহ শনাক্ত, দেশে আনার উদ্যোগ শুক্রবার (১ মে) ফ্লোরিডা পুলিশ বিভাগ বৃষ্টির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিশ্চিত করে যে, উদ্ধার করা দ্বিতীয় মরদেহটি তারই। দীর্ঘ অনিশ্চয়তার পর এই তথ্য পরিবারকে যেমন শোকাহত করেছে, তেমনি ঘটনার নিষ্ঠুর বাস্তবতাও সামনে নিয়ে এসেছে। পরিবারের পক্ষ থেকে দ্রুত মরদেহ দেশে পাঠানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। জানা গেছে, ওয়াশিংটন ডিসিতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস এবং মিয়ামির বাংলাদেশ কনস্যুলেট যৌথভাবে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শুরু করেছে। সব প্রক্রিয়া শেষ হলে শিগগিরই বৃষ্টির মরদেহ দেশে আনা হবে। লিমনের মরদেহ আসছে ৪ মে অপরদিকে, জামিল আহমেদ লিমনের মরদেহ ২ মে ফ্লোরিডার অরল্যান্ডো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পাঠানো হবে। মধ্যবর্তী ট্রানজিট হিসেবে দুবাই হয়ে ৪ মে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। পরিবারের সদস্যরা ইতোমধ্যে মরদেহ গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। লিমনের এক আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “আমরা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না এমন ঘটনা ঘটতে পারে। ওর মরদেহ অন্তত দেশে এনে দাফন করতে পারব—এটাই এখন আমাদের একমাত্র সান্ত্বনা।” শিক্ষাজীবনে মেধাবী ছিলেন বৃষ্টি নাহিদা বৃষ্টি ইউনিভার্সিটি অব সাউথ ফ্লোরিডায় কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত ছিলেন। এর আগে তিনি নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রি অ্যান্ড কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে স্নাতক সম্পন্ন করেন। শিক্ষক ও সহপাঠীদের কাছে তিনি ছিলেন মেধাবী ও পরিশ্রমী একজন শিক্ষার্থী। একজন সহপাঠী জানান, “বৃষ্টি খুবই মেধাবী ছিল। সবসময় হাসিখুশি থাকত। এমন পরিণতি মেনে নেওয়া খুব কঠিন।” নিখোঁজ থেকে রহস্য উন্মোচন গত ১৬ এপ্রিল লিমনের টাম্পার বাসা থেকে সর্বশেষ দেখা যায় তাকে। এরপর থেকেই তিনি নিখোঁজ ছিলেন। একই সময় বৃষ্টিও নিখোঁজ হন, যা পরে বড় ধরনের উদ্বেগ সৃষ্টি করে। এই ঘটনার তদন্তে লিমনের রুমমেট, ২৬ বছর বয়সী মার্কিন নাগরিক হিশাম সালেহ আবুগারবিয়েহকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে হত্যার অভিযোগ আনা হয়েছে বলে স্থানীয় আদালতের নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। আদালতের নথিতে উঠে এসেছে ভয়াবহ বিবরণ ফ্লোরিডার স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালতে দাখিল করা নথিতে ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ উঠে এসেছে। তদন্তকারীদের দাবি অনুযায়ী, দুই শিক্ষার্থীকে একটি বাসার ভেতরে হত্যা করা হয়। পরে মরদেহ গোপন করার চেষ্টা করা হয়। নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, লিমনের মরদেহ একটি বড় প্লাস্টিকের ব্যাগে ভরে একটি ব্রিজের পাশ থেকে ফেলে দেওয়া হয়। উদ্ধার করার সময় ওই ব্যাগ থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল বলে তদন্তকারীরা জানিয়েছেন। এছাড়া, ঘটনাস্থল পরিষ্কার করতে বিভিন্ন ক্লিনিং সরঞ্জাম ব্যবহার করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে। আবর্জনা সংকুচিত করার যন্ত্রে (ট্র্যাশ কম্প্যাক্টর) পাওয়া রক্তের নমুনা থেকে দুইজনের উপস্থিতির বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। প্রযুক্তিগত তথ্য ও তদন্তের অগ্রগতি তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, মোবাইল ফোনের লোকেশন ডেটা বিশ্লেষণ করে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। নিহতদের ফোনের কাছাকাছি এবং মরদেহ ফেলার স্থানের আশেপাশে অভিযুক্ত ব্যক্তির ফোনের উপস্থিতি পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া, তদন্তে এমন তথ্যও উঠে এসেছে যে, অনলাইনে বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনা এবং ঘটনার আগে কিছু বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করা হয়েছিল। তবে এসব তথ্য এখনো তদন্তাধীন এবং আদালতে প্রমাণ হিসেবে যাচাই প্রক্রিয়ায় রয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে উদ্বেগ এই ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছে। অনেকেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন। টাম্পায় বসবাসরত এক প্রবাসী বাংলাদেশি বলেন, “এমন ঘটনা আমাদের জন্য খুবই ভয়ংকর। সন্তানদের নিরাপত্তা নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় আছি।” প্রশাসনের ভূমিকা ও প্রয়োজনীয়তা বাংলাদেশ দূতাবাস ও কনস্যুলেট ইতোমধ্যে মরদেহ দেশে পাঠানো এবং পরিবারের সঙ্গে সমন্বয়ের কাজ করছে। একইসঙ্গে তারা তদন্ত প্রক্রিয়ায় স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিদেশে থাকা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি, এমন ঘটনায় দ্রুত কনস্যুলার সহায়তা নিশ্চিত করাও জরুরি। অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া এই ঘটনায় গ্রেফতার ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের বিষয়ে তার আইনজীবীর সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে, তবে এ বিষয়ে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। উপসংহার ফ্লোরিডায় দুই বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর এই রহস্যজনক মৃত্যু শুধু দুইটি পরিবারের জন্য নয়, পুরো দেশের জন্যই একটি বেদনাদায়ক ঘটনা। তদন্ত এখনও চলমান, এবং চূড়ান্ত সত্য উদঘাটনের অপেক্ষায় রয়েছে সবাই। এরই মধ্যে স্বজন হারানোর শোক নিয়ে দুই পরিবার অপেক্ষা করছে প্রিয়জনের মরদেহ দেশে ফেরার—শেষ বিদায়ের জন্য।

ফ্লোরিডায় রহস্যজনক জোড়া মৃত্যু: বৃষ্টির মরদেহ শনাক্ত, লিমনের লাশ দেশে আসছে ৪ মে