ইরানকে ঘিরে নতুন সামরিক পরিকল্পনা—যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য ‘স্বল্প কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার প্রস্তুতি
মধ্যপ্রাচ্যে আবারও উত্তেজনা বাড়ছে। ইরানের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য নতুন সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন প্রশাসনের ভেতরে জোর আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। এই পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে শিগগিরই ব্রিফ করার কথা রয়েছে দেশটির সামরিক নেতৃত্বের।
সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা কী?
মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) ইরানের বিরুদ্ধে একটি ‘স্বল্প সময়ের কিন্তু শক্তিশালী’ হামলার পরিকল্পনা তৈরি করেছে। অজ্ঞাত সূত্রের বরাতে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, সম্ভাব্য এই অভিযানে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে।[TECHTARANGA-POST:988]
পরিকল্পনার মধ্যে দফায় দফায় হামলার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে বলে জানা গেছে। অর্থাৎ একবারে বড় আকারের আক্রমণের বদলে নির্দিষ্ট সময় ব্যবধানে একাধিক হামলা চালানোর কৌশল বিবেচনায় রাখা হয়েছে।
তবে এই বিষয়ে হোয়াইট হাউজ কিংবা সেন্টকম আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি। বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ বিষয়ে জানতে চাইলে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে কৌশল
প্রতিবেদন অনুযায়ী, সম্ভাব্য অভিযানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই জলপথের একটি অংশ দখল করে সেখানে জাহাজ চলাচল পুনরায় স্বাভাবিক করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানি সরবরাহের প্রধান রুট। এখানে উত্তেজনা তৈরি হলে বৈশ্বিক তেলবাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র যদি এই এলাকায় সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তার প্রভাব শুধু ইরান বা মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।[TECHTARANGA-POST:974]
একজন আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা মানে শুধু সামরিক নয়, অর্থনৈতিক চাপও তৈরি করা। এটি কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।”
বিশেষ বাহিনীর সম্ভাব্য অভিযান
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদ নিরাপদ করার জন্য বিশেষ বাহিনীর অভিযান চালানোর পরিকল্পনাও থাকতে পারে। এই ধরনের অভিযান সাধারণত অত্যন্ত গোপনীয় এবং ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে।
এ বিষয়ে এক সাবেক সামরিক কর্মকর্তা বলেন, “এ ধরনের মিশনে নির্ভুল গোয়েন্দা তথ্য এবং দ্রুত অপারেশন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভুল হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে যেতে পারে।”
সাম্প্রতিক সংঘাতের প্রেক্ষাপট
গত কয়েক মাস ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনা চরমে ওঠে। ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানে আকস্মিক হামলা চালানো হয় বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন স্থানে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলার ঘটনা ঘটে।
টানা সংঘাতের পর এপ্রিলের শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে একটি যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় বলে জানা যায়। তবে এই যুদ্ধবিরতি কতটা স্থায়ী হবে, তা নিয়ে শুরু থেকেই সংশয় ছিল।
বর্তমান পরিকল্পনার খবর সামনে আসার পর সেই সংশয় আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।[TECHTARANGA-POST:929]
সম্ভাব্য প্রভাব কী হতে পারে?
এই ধরনের সামরিক অভিযান বাস্তবায়িত হলে তার বহুমাত্রিক প্রভাব পড়তে পারে।
১. আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বৃদ্ধি:
মধ্যপ্রাচ্য আগে থেকেই উত্তেজনাপূর্ণ অঞ্চল। নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু হলে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে উঠতে পারে।
২. জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা:
হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক কোনো পদক্ষেপ বৈশ্বিক তেল সরবরাহে প্রভাব ফেলতে পারে, যার ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে।
৩. কূটনৈতিক সম্পর্কের অবনতি:
এ ধরনের পদক্ষেপ আন্তর্জাতিক মহলে বিতর্ক সৃষ্টি করতে পারে এবং বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কেও প্রভাব ফেলতে পারে।
প্রশাসনের অবস্থান ও নীরবতা
এখন পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে এই পরিকল্পনা সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। একইভাবে ইরানের পক্ষ থেকেও সরাসরি কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে সরকারগুলো অনেক সময় কৌশলগত কারণে নীরবতা বজায় রাখে।
আন্তর্জাতিক মহলের উদ্বেগ
এই প্রতিবেদনের পর আন্তর্জাতিক মহলে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্র বলছে, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
একজন ইউরোপীয় কূটনীতিক বলেন, “বর্তমান পরিস্থিতিতে উত্তেজনা কমানোই সবচেয়ে জরুরি। নতুন সামরিক পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।”
উপসংহার
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পরিকল্পনার খবর মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিকে আবারও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে। যদিও এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু নিশ্চিত করা হয়নি, তবুও এই ধরনের তথ্য সামনে আসা নিজেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত বহন করে।
আগামী দিনগুলোতে কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়বে, নাকি নতুন করে সংঘাতের দিকে পরিস্থিতি এগোবে—তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। বিশ্বজুড়ে নজর এখন সেদিকেই।