হানিট্র্যাপে সিঙ্গাপুর প্রবাসী অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়, নরসিংদীতে নারীসহ চারজন গ্রেপ্তার
নরসিংদীতে হানিট্র্যাপের মাধ্যমে এক সিঙ্গাপুর প্রবাসীকে অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়েছে। দীর্ঘ তদন্তের পর নরসিংদী মডেল থানা পুলিশ নারীসহ সংঘবদ্ধ চক্রের চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করেছে। ঘটনাটি স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।পুলিশ বলছে, এটি একটি পরিকল্পিত অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা, যেখানে প্রলোভনের ফাঁদ ব্যবহার করা হয়েছে।ভেলানগর থেকে অপহরণের ঘটনাপুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ২২ জানুয়ারি বিকেলে নরসিংদীর ভেলানগর বাসস্ট্যান্ড এলাকা থেকে সিঙ্গাপুর প্রবাসী রঞ্জিত দত্তকে অপহরণ করা হয়।অভিযোগ অনুযায়ী, একটি নারীকে ব্যবহার করে তাকে প্রথমে যোগাযোগের ফাঁদে ফেলা হয়। পরে ৫ থেকে ৬ জনের একটি দল তাকে জোরপূর্বক অটোরিকশায় তুলে পূর্ব ভেলানগরের একটি নির্জন ভবনে নিয়ে যায়।নির্যাতন ও মুক্তিপণ আদায়নির্জন ভবনে নিয়ে গিয়ে তাকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রাখা হয়। এ সময় তাকে মারধর করা হয় এবং প্রাণনাশের ভয় দেখিয়ে পরিবারের কাছ থেকে তিন লাখ টাকা আদায় করা হয়।টাকা আদায়ের পর তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। বাড়িতে ফিরে পুরো ঘটনা জানালে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে এবং পরে থানায় অভিযোগ করা হয়।থানায় মামলা ও তদন্ত শুরুঘটনার পর ভুক্তভোগীর স্ত্রী সুস্মিতা রায় নরসিংদী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ পাওয়ার পরই পুলিশ ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে বিশেষ টিম গঠন করে তদন্ত শুরু করে।তদন্তের ধারাবাহিকতায় ধীরে ধীরে চক্রের সদস্যদের পরিচয় শনাক্ত করা হয়।নারীসহ চারজন গ্রেপ্তারপরে অভিযান চালিয়ে পুলিশ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন—
নাজমা ওরফে ইয়াসমিন (২৬)
মো. সালাউদ্দিন (৩৫)
মো. নুরুজ্জামান সবুজ (৩৮)
সোহেল বাবু (২৮)
পুলিশের দাবি, এদের মধ্যে নারী সদস্য নাজমা মূলত ভুক্তভোগীর সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করে তাকে নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়ার কাজ করেন।জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকারোক্তিপ্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেপ্তারকৃতরা অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির একাধিক ধারায় মামলা করা হয়েছে এবং আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।হানিট্র্যাপ চক্র নিয়ে নতুন উদ্বেগপুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে হানিট্র্যাপ বা প্রলোভনের ফাঁদ ব্যবহার করে অপরাধের প্রবণতা কিছু এলাকায় বেড়েছে।বিশেষ করে প্রবাসী বা বিদেশফেরত ব্যক্তিদের টার্গেট করা হচ্ছে। কারণ, তাদের কাছে অর্থ থাকে এবং পরিবার দ্রুত মুক্তিপণ দিতে বাধ্য হয় বলে ধারণা করা হয়।সামাজিক মাধ্যমে পরিচয় থেকে অপরাধআইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় গড়ে তুলে পরে সেটিকে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল বা অপহরণের ঘটনা ঘটছে।তবে নরসিংদীর এই ঘটনায় সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রলোভনের মাধ্যমে অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায়ের বিষয়টি নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।বিশেষজ্ঞদের মতামতঅপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের চক্র সাধারণত সংগঠিতভাবে কাজ করে। একজন ভিকটিমের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে, অন্যরা অপহরণ ও ভয়ভীতি দেখানোর কাজ করে।অনেক ভুক্তভোগী সামাজিক লজ্জা বা মানসিক চাপের কারণে অভিযোগ করতে দেরি করেন, যার ফলে অপরাধীরা আরও সাহস পেয়ে যায়।পুলিশের সতর্কতা ও অভিযাননরসিংদী জেলা পুলিশ জানিয়েছে, এই ধরনের অপরাধ দমনে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে। বিশেষ করে নির্জন ভবন, ভাড়া বাসা ও সন্দেহজনক স্থানে নজরদারি জোরদার করা হবে।পাশাপাশি সাধারণ মানুষ ও প্রবাসীদের সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।আরও জড়িত থাকার সম্ভাবনাপুলিশের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, গ্রেপ্তার চারজনের বাইরে আরও কেউ এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে আরও গ্রেপ্তার করা হবে।স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়াস্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, দ্রুত পুলিশের পদক্ষেপে তারা স্বস্তি পেয়েছেন। তাদের মতে, এমন অপরাধ দ্রুত দমন না হলে ভবিষ্যতে আরও মানুষ একই ধরনের ফাঁদে পড়তে পারে।শেষ কথা
নরসিংদীর এই ঘটনা শুধু একটি অপহরণের মামলা নয়, বরং নতুন ধরনের সংঘবদ্ধ অপরাধচক্রের একটি সতর্ক সংকেত। প্রযুক্তি ও প্রলোভনের অপব্যবহার করে গড়ে ওঠা এসব অপরাধ দমনে যেমন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ প্রয়োজন, তেমনি সাধারণ মানুষের সচেতনতাও অত্যন্ত জরুরি।