দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর
সর্বশেষ

ঈদের আমেজ শেষে নতুন সিনেমার ঢেউ: হলে এলো ‘আতরবিবিলেন’ ও ‘মানুষটিকে দেখ’, সঙ্গে হলিউডের চমক

ঈদের রেশ এখনো কাটেনি দেশের সিনেমা হলে। এক মাস পার হলেও ঈদে মুক্তি পাওয়া ছবিগুলো দর্শক টানছে নিয়মিত। এই আবহেই নতুন করে প্রেক্ষাগৃহে যুক্ত হলো দুই ভিন্নধর্মী দেশীয় সিনেমা—‘আতরবিবিলেন’ ও ‘মানুষটিকে দেখ’। একই সময়ে সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পেয়েছে বহুল আলোচিত হলিউড সিনেমা ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা টু’, যা দর্শকদের মধ্যে আলাদা আগ্রহ তৈরি করেছে।প্রেক্ষাগৃহে নতুন সংযোজনচলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঈদের পর সাধারণত সিনেমা হল কিছুটা ফাঁকা হয়ে যায়। তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। আগের সিনেমাগুলোর পাশাপাশি নতুন ছবি যুক্ত হওয়ায় দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাগৃহে ইতোমধ্যে নতুন দুটি দেশীয় সিনেমার প্রদর্শনী শুরু হয়েছে।[TECHTARANGA-POST:1033]একাধিক হল মালিক জানিয়েছেন, “ঈদের ছবিগুলোর পাশাপাশি নতুন গল্পের সিনেমা আসায় দর্শকরা বৈচিত্র্য পাচ্ছেন। এতে হলের পরিবেশও প্রাণবন্ত থাকছে।”‘আতরবিবিলেন’: প্রান্তিক নারীর সংগ্রামের গল্প‘আতরবিবিলেন’ সিনেমাটি মূলত এক প্রান্তিক নারীর জীবনের কঠিন বাস্তবতা ও সংগ্রামের গল্প তুলে ধরে। আতরবিবি নামের একজন নারী, যার স্বপ্ন ছিল স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনযাপন। কিন্তু বাস্তবতার চাপে তাকে বারবার প্রতারিত হতে হয়।চলচ্চিত্রটিতে দেখানো হয়েছে সমাজের তথাকথিত ভদ্রবেশী মানুষের স্বার্থপরতা এবং সেই প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে আতরবিবির লড়াই। গল্পটি এগিয়েছে তার ব্যক্তিগত সংগ্রাম, বেঁচে থাকার চেষ্টা এবং নিজের মর্যাদা রক্ষার পথ ধরে।এই সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফারজানা সুমি, যিনি একই সঙ্গে ছবিটির প্রযোজকও। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে দেখা গেছে মুস্তফা প্রকাশ, রাশেদ মামুন অপু, আশীষ খন্দকার, এলিনা শাম্মী, সানজিদা মিলা, জয়রাজসহ আরও অনেককে।পরিচালনা করেছেন মিজানুর রহমান লাবু। জানা গেছে, তিনি নিজেই ছবির কাহিনি, সংলাপ ও চিত্রনাট্য লিখেছেন।একজন দর্শক নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক থেকে বলেন, “ছবিটা আমাদের সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরেছে। অনেক সময় আমরা এসব গল্প চোখে দেখলেও গুরুত্ব দিই না, কিন্তু সিনেমায় দেখলে ভাবতে বাধ্য হই।”‘মানুষটিকে দেখ’: কুসংস্কার ভাঙার গল্পঅন্যদিকে ‘মানুষটিকে দেখ’ সিনেমাটি নির্মিত হয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা নিয়ে। এটি মূলত সেরিব্রাল পালসি সম্পর্কে সমাজে প্রচলিত কুসংস্কার ও ভুল ধারণা ভাঙার চেষ্টা করে।সিনেমার কেন্দ্রীয় চরিত্র ফরিদা, একজন তরুণী যিনি সেরিব্রাল পালসিতে আক্রান্ত। হুইলচেয়ারে বসেই তাকে চলাফেরা করতে হয়। সমাজের অবহেলা, কটূক্তি ও সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সে নিজের অধিকার আদায়ে লড়াই চালিয়ে যায়।[TECHTARANGA-POST:1022]তার এই সংগ্রামে পাশে দাঁড়ায় ফিরোজ নামের এক তরুণ, যিনি পথশিশুদের নিয়ে কাজ করেন। দুজনের যৌথ প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে উঠে এসেছে মানবিকতা, সংগ্রাম এবং সামাজিক সচেতনতার বার্তা।ছবিটি পরিচালনা করেছেন গাজী রাকায়েত। এটি তার তৃতীয় সিনেমা। এর আগে তিনি ‘মৃত্তিকা মায়া’ এবং ‘গোর’ নির্মাণ করে প্রশংসা পেয়েছিলেন।এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণে অর্থায়ন করেছে সেন্টার ফর দ্য রিহ্যাবিলিটেশন অব দ্য প্যারালাইজড (সিআরপি)। অভিনয়ে রয়েছেন রাশনা শারমিন কেমি, তাহমিদ আরেফিন হক, তারিক আনাম খান, মিলি বাশার, মামুনুর রশীদসহ আরও অনেকে।একজন সমাজকর্মী জানান, “এ ধরনের সিনেমা সমাজে সচেতনতা তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। বিশেষ করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে এমন উদ্যোগ প্রয়োজন।”হলিউডের চমক: ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা টু’দেশীয় সিনেমার পাশাপাশি সিনেপ্লেক্সে মুক্তি পেয়েছে বহুল প্রতীক্ষিত হলিউড ছবি ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা টু’। প্রায় দুই দশক আগে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।নতুন এই সিক্যুয়েলেও রয়েছে ফ্যাশন জগতের প্রতিযোগিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং ব্যক্তিগত জীবনের টানাপোড়েনের গল্প। আগের ছবির ধারাবাহিকতায় এটিও পরিচালনা করেছেন ডেভিড ফ্রাঙ্কেল।[TECHTARANGA-POST:1017]ছবিটির অন্যতম আকর্ষণ তিন জনপ্রিয় অভিনেত্রী—মেরিল স্ট্রিপ, অ্যান হ্যাথাওয়ে ও এমিলি ব্লান্টের উপস্থিতি। তাদের অভিনয় দর্শকদের আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।রাজধানীর এক সিনেপ্লেক্সে সিনেমাটি দেখতে আসা এক তরুণ বলেন, “প্রথম সিনেমাটা অনেক পছন্দ ছিল। তাই দ্বিতীয়টি মুক্তি পাওয়ার খবর শুনেই দেখতে চলে এসেছি।”দর্শক প্রতিক্রিয়া ও হল পরিস্থিতিহল সংশ্লিষ্টদের দাবি, নতুন তিনটি সিনেমা মুক্তির ফলে দর্শক উপস্থিতি কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে তরুণ দর্শকরা হলিউড ছবির দিকে ঝুঁকছেন, আর পরিবারসহ অনেকেই দেশীয় সিনেমা দেখতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন।একজন হল ব্যবস্থাপক জানান, “দেশীয় ও বিদেশি—দুই ধরনের সিনেমা একসঙ্গে চলায় দর্শক বিভাজন হলেও মোট উপস্থিতি খারাপ নয়।”তবে কিছু দর্শক অভিযোগ করেছেন, সব হলে সব সিনেমা পাওয়া যাচ্ছে না। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।চলচ্চিত্রের প্রভাব ও বিশ্লেষণচলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের বৈচিত্র্যময় মুক্তি দেশের সিনেমা শিল্পের জন্য ইতিবাচক। সামাজিক বার্তাধর্মী সিনেমা যেমন সচেতনতা বাড়ায়, তেমনি বাণিজ্যিক ও আন্তর্জাতিক সিনেমা দর্শকদের বিনোদনের চাহিদা পূরণ করে।‘আতরবিবিলেন’ ও ‘মানুষটিকে দেখ’—দুটি সিনেমাই সমাজের ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। একটি প্রান্তিক নারীর সংগ্রাম, অন্যটি প্রতিবন্ধী মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলে।বিশ্লেষকদের মতে, “এই ধরনের সিনেমা শুধু বিনোদন নয়, সামাজিক পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে পারে।”প্রশাসনের ভূমিকা ও করণীয়চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দেশীয় সিনেমার উন্নয়নে সরকারের আরও কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষ করে ভালো গল্পের সিনেমাগুলোর প্রচার ও প্রদর্শনের সুযোগ বাড়ানো জরুরি।একজন প্রযোজক বলেন, “ভালো সিনেমা তৈরি হচ্ছে, কিন্তু সঠিকভাবে দর্শকের কাছে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এখানে প্রশাসনিক সহায়তা দরকার।”উপসংহারঈদের পরও সিনেমা হলে দর্শকদের উপস্থিতি ধরে রাখতে নতুন সিনেমাগুলোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ‘আতরবিবিলেন’ ও ‘মানুষটিকে দেখ’ যেমন সমাজের বাস্তবতা তুলে ধরছে, তেমনি ‘দ্য ডেভিল ওয়্যারস প্রাডা টু’ যোগ করেছে আন্তর্জাতিক বিনোদনের স্বাদ। সব মিলিয়ে বলা যায়, এই সময়টা দেশের সিনেমা দর্শকদের জন্য বৈচিত্র্যময় অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়—এই ধারাবাহিকতা কতটা ধরে রাখা যায় এবং দর্শকরা কতটা সাড়া দেন।

ঈদের আমেজ শেষে নতুন সিনেমার ঢেউ: হলে এলো ‘আতরবিবিলেন’ ও ‘মানুষটিকে দেখ’, সঙ্গে হলিউডের চমক