দেশে চলমান হামজনিত নিউমোনিয়ায় শিশুদের শ্বাসকষ্ট মোকাবিলায় এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে স্বল্পমূল্যের শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়ক যন্ত্র ‘বাবল সিপ্যাপ’। আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি) এই জীবনরক্ষাকারী প্রযুক্তি দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে সরবরাহ ও ব্যবহারে সহায়তা করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো এই যন্ত্র ব্যবহার করলে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুহার প্রায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব।
আইসিডিডিআর,বির এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, বাবল কন্টিনিউয়াস পজিটিভ এয়ারওয়ে প্রেশার (বিসিপ্যাপ) পদ্ধতির ব্যবহার ইতোমধ্যে দেশের ৬টি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শুরু হয়েছে। গত ৭ এপ্রিল পর্যন্ত তীব্র শ্বাসকষ্টে আক্রান্ত ২৯ জন শিশু এই সেবা গ্রহণ করেছে এবং তাদের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল রাখতে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পাওয়া গেছে।
এই প্রযুক্তিটি উদ্ভাবন করেছেন আইসিডিডিআর,বির সিনিয়র সায়েন্টিস্ট মোহাম্মদ যোবায়ের চিশতী ও তার দল। বাবল সিপ্যাপ মূলত গুরুতর নিউমোনিয়া ও রক্তে অক্সিজেনের ঘাটতিতে ভোগা শিশুদের ফুসফুস সচল রাখতে সহায়তা করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ বাড়ায়। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ভেন্টিলেটরের প্রয়োজন পড়ে না।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সহযোগিতায় এই কার্যক্রম দেশব্যাপী সম্প্রসারণ করা হচ্ছে। আইসিডিডিআর,বি এর অংশ হিসেবে চিকিৎসক ও নার্সদের হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। ইতোমধ্যে ৩০টিরও বেশি হাসপাতালের ৭৫ জনের বেশি স্বাস্থ্যকর্মী এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছেন।
ঢাকায় আয়োজিত এক প্রশিক্ষণে বিভিন্ন মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেলা সদর হাসপাতালের ৩০ জন সেবাদানকারী অংশ নেন। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তারা নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে দ্রুত এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করতে সক্ষম হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
আইসিডিডিআর,বির নির্বাহী পরিচালক ড. থ্যাডিয়াস ডেভিস এই উদ্যোগকে যুগান্তকারী হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বাংলাদেশে উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তি শুধু দেশেই নয়, আফ্রিকার বিভিন্ন দেশেও শিশুদের প্রাণ বাঁচাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সীমিত সম্পদের মধ্যেও এটি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের যুগ্ম সচিব মুহাম্মদ মোস্তাফিজুর রহমান জানান, বাবল সিপ্যাপের যথাযথ ব্যবহার ইতোমধ্যেই শিশুদের মৃত্যু ও জটিলতা কমাতে সহায়তা করছে। তিনি দেশের সব হাসপাতালে এর ব্যবহার বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পদ্ধতি ব্যবহারে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মেনে চলা জরুরি। যেমন— সঠিক রোগী নির্বাচন, দ্রুত চিকিৎসা শুরু, অক্সিজেনের মাত্রা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত রেফার করা।
শিশু বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, বাবল সিপ্যাপ একটি নন-ইনভেসিভ পদ্ধতি, যেখানে নাকের মাধ্যমে অক্সিজেন দেওয়া হয় এবং পানিতে ডুবানো নলের মাধ্যমে বুদবুদ তৈরি করে ফুসফুসে চাপ বজায় রাখা হয়। এতে ফুসফুস খোলা থাকে, শ্বাসকষ্ট কমে এবং অক্সিজেন গ্রহণ বাড়ে।
ঢাকা শিশু হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ডা. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, “এই যন্ত্রটি কার্যকর ও সাশ্রয়ী। দেশের হাসপাতালগুলোতে এর ব্যবহার আরও বাড়ানো উচিত।”
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো— এই জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রটির সম্ভাব্য মূল্য মাত্র প্রায় ৩০০ টাকা, যা বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক।
আইসিডিডিআর,বি জানিয়েছে, ভবিষ্যতে রাজশাহী, বরগুনা, ময়মনসিংহ, সিলেট, চট্টগ্রাম ও নাটোরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সরাসরি প্রশিক্ষণ ও পর্যবেক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম প্রতিরোধ এবং নিউমোনিয়ার উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে এই প্রযুক্তির বিস্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শিশুদের প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু কমাতে বাবল সিপ্যাপ হতে পারে একটি বড় হাতিয়ার।
আপনার মতামত লিখুন