মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের দামামা: ‘এক ইঞ্চি মাটিও ছাড়বে না ইরান’
তেহরান/ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তাপ ছড়িয়ে যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহিত হওয়ার পর দেশটির নেতৃত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছেন, শত্রুকে ইরানের এক ইঞ্চি জমিও দখল করতে দেওয়া হবে না।
১. ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি ও যুদ্ধের প্রস্তুতি
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়েছেন, যারা ইরানের ওপর হামলা চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে তেহরান ‘কঠোর ও জোরালো’ জবাব দেবে। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ইচ্ছা পোষণ করলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা হলে তার পাল্টা জবাব দেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
অন্যদিকে, ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি (IRGC) জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অন্তত ৬ মাস তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। বর্তমানে তারা প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে।
২. তেহরানে ‘কালো বৃষ্টি’ ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তেহরানের শাহরান তেল শোধনাগারসহ একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর ফলে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, তেল ডিপোতে আগুনের কারণে আকাশে তেলমিশ্রিত ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে তেহরানে অদ্ভুত ‘কালো বৃষ্টি’ ঝরতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বৃষ্টির পানি কালচে এবং তাতে তেলের কড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
৩. সংঘাতের বিস্তার: আক্রান্ত সৌদি, কুয়েত ও জর্ডান
যুদ্ধ কেবল ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলে:
জর্ডান: এখানে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
কুয়েত: দেশটির বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে, যার ফলে তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত।
সৌদি আরব ও কাতার: এই দেশগুলোও নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার খবর দিয়েছে।
লেবানন: দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ প্রায় ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন।
৪. ট্রাম্পকে চরম হুঁশিয়ারি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ভুল আন্তর্জাতিক হিসাব-নিকাশ’-কে দায়ী করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা ট্রাম্পকে ছাড়ব না, এই ভুলের জন্য তাকে মাশুল গুনতেই হবে।”
বিপরীতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলের কাছে ২৭ হাজার বোমা (মূল্য ৬৬ কোটি ডলার) সরবরাহের তোড়জোড় শুরু করেছে ওয়াশিংটন।
৫. নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ পর্ষদ সম্ভাব্য একজন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করার পথে রয়েছে।
বিশ্বের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে চীন ও তুরস্ক কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে ইরান ইস্যুতে সংলাপের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্ট করেছেন যে, সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
৬. বৈশ্বিক প্রভাব
যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিতে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারে।

সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ মার্চ ২০২৬
মধ্যপ্রাচ্যে মহাযুদ্ধের দামামা: ‘এক ইঞ্চি মাটিও ছাড়বে না ইরান’
তেহরান/ঢাকা: মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে উত্তাপ ছড়িয়ে যুদ্ধ দ্বিতীয় সপ্তাহে গড়িয়েছে। ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহিত হওয়ার পর দেশটির নেতৃত্ব ও অস্তিত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে তিনি ঘোষণা করেছেন, শত্রুকে ইরানের এক ইঞ্চি জমিও দখল করতে দেওয়া হবে না।
১. ইরানের কঠোর হুঁশিয়ারি ও যুদ্ধের প্রস্তুতি
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান সাফ জানিয়েছেন, যারা ইরানের ওপর হামলা চালাবে, তাদের বিরুদ্ধে তেহরান ‘কঠোর ও জোরালো’ জবাব দেবে। তিনি প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ইচ্ছা পোষণ করলেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, অন্য কোনো দেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে হামলা হলে তার পাল্টা জবাব দেওয়া ছাড়া বিকল্প থাকবে না।
অন্যদিকে, ইরানের শক্তিশালী সামরিক বাহিনী আইআরজিসি (IRGC) জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে অন্তত ৬ মাস তীব্র যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম। বর্তমানে তারা প্রথম ও দ্বিতীয় প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করলেও ভবিষ্যতে আরও উন্নত ও দীর্ঘপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের হুমকি দিয়েছে।
২. তেহরানে ‘কালো বৃষ্টি’ ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) তেহরানের শাহরান তেল শোধনাগারসহ একাধিক জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালিয়েছে। এর ফলে আকাশ কালো ধোঁয়ায় ঢেকে যায়। মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর দাবি, তেল ডিপোতে আগুনের কারণে আকাশে তেলমিশ্রিত ধোঁয়ার সৃষ্টি হয়েছে, যার ফলে তেহরানে অদ্ভুত ‘কালো বৃষ্টি’ ঝরতে দেখা গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বৃষ্টির পানি কালচে এবং তাতে তেলের কড়া গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে।
৩. সংঘাতের বিস্তার: আক্রান্ত সৌদি, কুয়েত ও জর্ডান
যুদ্ধ কেবল ইরান-ইসরায়েলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, ছড়িয়ে পড়ছে পুরো অঞ্চলে:
জর্ডান: এখানে অবস্থিত মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে ইরান।
কুয়েত: দেশটির বিমানবন্দরের জ্বালানি ট্যাংকারে হামলা হয়েছে, যার ফলে তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে কুয়েত।
সৌদি আরব ও কাতার: এই দেশগুলোও নতুন করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার শিকার হওয়ার খবর দিয়েছে।
লেবানন: দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি হামলায় শিশুসহ প্রায় ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন।
৪. ট্রাম্পকে চরম হুঁশিয়ারি ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের সচিব আলী লারিজানি বর্তমান পরিস্থিতির জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ভুল আন্তর্জাতিক হিসাব-নিকাশ’-কে দায়ী করেছেন। তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “আমরা ট্রাম্পকে ছাড়ব না, এই ভুলের জন্য তাকে মাশুল গুনতেই হবে।”
বিপরীতে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছেন। এদিকে মার্কিন কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইসরায়েলের কাছে ২৭ হাজার বোমা (মূল্য ৬৬ কোটি ডলার) সরবরাহের তোড়জোড় শুরু করেছে ওয়াশিংটন।
৫. নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা
আলী খামেনির মৃত্যুর পর ইরানে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞ পর্ষদ সম্ভাব্য একজন প্রার্থীর নাম চূড়ান্ত করার পথে রয়েছে।
বিশ্বের এই উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে চীন ও তুরস্ক কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপে ইরান ইস্যুতে সংলাপের পরিবেশ তৈরির ওপর জোর দিয়েছেন। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই স্পষ্ট করেছেন যে, সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়।
৬. বৈশ্বিক প্রভাব
যুদ্ধের কারণে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি ঝুঁকিতে পড়েছে। এর ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে বিশ্ব অর্থনীতি ও শেয়ারবাজারে।

আপনার মতামত লিখুন