টানা বৃষ্টির আভাস, হাওরে আকস্মিক বন্যার শঙ্কা—সতর্কবার্তা আবহাওয়া অফিসের
এপ্রিলের শেষ দিকে এসে দেশের আবহাওয়ায় হঠাৎ পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। কয়েকদিন আগেও যেখানে তীব্র তাপপ্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত ছিল, সেখানে এখন সামনে দেখা দিচ্ছে টানা বৃষ্টি ও সম্ভাব্য দুর্যোগের আশঙ্কা। আবহাওয়াবিদদের মতে, আগামী সোমবার থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শুরু হতে পারে বৃষ্টিপাত, যা কিছু এলাকায় ভারী থেকে অতিভারী পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।সোমবার থেকে বৃষ্টির সম্ভাবনা, বাড়বে দুর্যোগের ঝুঁকিআবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ এপ্রিল সোমবার থেকে শুরু হয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হতে পারে। শুরুতে সিলেট, রংপুর ও ময়মনসিংহ বিভাগে বৃষ্টির প্রবণতা বেশি থাকবে। এরপর ধীরে ধীরে তা বিস্তৃত হয়ে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগেও ছড়িয়ে পড়তে পারে।এই সময়ের মধ্যে বজ্রসহ বৃষ্টি এবং কালবৈশাখী ঝড়ের আশঙ্কাও রয়েছে। ফলে শুধু স্বস্তির বৃষ্টি নয়, বরং তা সঙ্গে নিয়ে আসতে পারে দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতি।[TECHTARANGA-POST:1089]বজ্রমেঘের ঘনত্ব বাড়ছে, টানা চারদিন ভারী বৃষ্টির আভাসজ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ ড. আবুল কালাম মল্লিক জানিয়েছেন, দেশের আকাশে ইতোমধ্যে বজ্রমেঘ তৈরির প্রবণতা বাড়ছে। তিনি বলেন, “সন্ধ্যার পর থেকেই এর প্রভাব দেখা যেতে পারে এবং টানা কয়েকদিন ভারী বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে।”তার মতে, এতে দিনের তাপমাত্রা কিছুটা কমে এলেও হঠাৎ করেই আবহাওয়া প্রতিকূল হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে ঝড়ো হাওয়া, বজ্রপাত ও অতিভারী বৃষ্টি একসঙ্গে হলে তা জনজীবনে প্রভাব ফেলতে পারে।উজানের ঢল বাড়াবে বন্যার ঝুঁকিশুধু বৃষ্টিপাত নয়, উজান থেকে নেমে আসা ঢল পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে বলে জানিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। বিশেষ করে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেতে পারে।সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সারিগোয়াইন, যাদুকাটা, মনু, খোয়াই ও কংস নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করার ঝুঁকিতে রয়েছে। এতে করে আশপাশের নিম্নাঞ্চলগুলোতে হঠাৎ করে পানি প্রবেশ করতে পারে।হাওর অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার আশঙ্কাএই পরিস্থিতিতে সুনামগঞ্জ, সিলেট, নেত্রকোনা, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাওর ও নিম্নাঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “ভারী বৃষ্টির পানি হাওরে দ্রুত জমে যায়। ফলে খুব অল্প সময়েই বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।”উপবিভাগীয় প্রকৌশলী পার্থ প্রতীম বড়ুয়া জানান, মেঘালয়ের উজানে অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত হলে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলে। তাই স্থানীয়ভাবে বৃষ্টি কম হলেও উজানের পানির কারণে হঠাৎ বন্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।কৃষিতে বড় ধরনের ক্ষতির আশঙ্কাহাওর অঞ্চল দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি এলাকা। এখানে বছরে একবার বোরো ধান উৎপাদন হয়, যা দেশের খাদ্য নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এই সময়ে আকস্মিক বন্যা দেখা দিলে পাকা ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে এমনই একটি আকস্মিক বন্যায় হাওর অঞ্চলের বিপুল পরিমাণ ধান পানিতে তলিয়ে যায়। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে এবার আগাম সতর্কতা জারি করা হয়েছে।পানি উন্নয়ন বোর্ড ইতোমধ্যে কৃষকদের দ্রুত ধান কেটে নিরাপদ স্থানে রাখার পরামর্শ দিয়েছে। কারণ, একবার পানি ঢুকে গেলে জমিতে থাকা ফসল রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।[TECHTARANGA-POST:1088]প্রশাসনের প্রস্তুতি জরুরিস্থানীয় প্রশাসনকেও সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা, নৌযান ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং জরুরি খাদ্য মজুত রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বিস্তারিত প্রস্তুতি বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।বজ্রপাত ও কালবৈশাখীর ঝুঁকিআবহাওয়াবিদরা বলছেন, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টিতে বজ্রঝড় ও কালবৈশাখীর প্রবণতা বেড়ে যায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয় বজ্রপাতের ঝুঁকি, যা গ্রামীণ এলাকায় প্রাণহানির কারণ হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের মতে, খোলা মাঠে কাজ করার সময় সতর্ক থাকা, ঝড়ের সময় নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া এবং বজ্রপাতের সময় গাছের নিচে না দাঁড়ানোর মতো সাধারণ সচেতনতাই বড় দুর্ঘটনা এড়াতে সাহায্য করতে পারে।সামনের দিনগুলোতে কী হতে পারেসব মিলিয়ে, আগামী কয়েকদিন দেশের আবহাওয়া অস্থির থাকার আশঙ্কা রয়েছে। একদিকে তাপপ্রবাহ থেকে স্বস্তি মিললেও অন্যদিকে বৃষ্টি, বন্যা ও ঝড়ের কারণে নতুন করে ভোগান্তির সৃষ্টি হতে পারে।বিশেষ করে হাওর অঞ্চলের মানুষদের জন্য এই সময়টা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, সামান্য দেরিতেই বছরের একমাত্র ফসল হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়।উপসংহার
পরিস্থিতি বিবেচনায় বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগাম প্রস্তুতি ও সচেতনতা থাকলে সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কৃষকদের দ্রুত ফসল ঘরে তোলা, স্থানীয় প্রশাসনের তৎপরতা বৃদ্ধি এবং সাধারণ মানুষের সতর্ক আচরণই হতে পারে এই দুর্যোগ মোকাবিলার প্রধান উপায়।[TECHTARANGA-POST:1087]