প্রিন্ট এর তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২৮ এপ্রিল ২০২৬
রাজধানীতে বেপরোয়া অটোরিকশা: বাড়ছে দুর্ঘটনা, দাবি দ্রুত নীতিমালার
মোঃ হাবিব, নির্বাহী সম্পাদক ||
রাজধানী ঢাকায় দিন দিন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। বড় সড়ক থেকে শুরু করে অলিগলি—প্রায় সর্বত্রই বেপরোয়া চলাচলের কারণে বাড়ছে দুর্ঘটনা, সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। নগরবাসীর মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ, আর সংশ্লিষ্টদের দাবি—এখনই কার্যকর নীতিমালা না আনলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হবে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অটোরিকশার অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এখন নিয়মিত সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ট্রাফিক সিগন্যাল অমান্য, উল্টো পথে চলা, হঠাৎ যাত্রী ওঠানামা—এসব কারণে সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ছে। বিশেষ করে আফতাবনগর, গুলশান ও বাড্ডা এলাকায় এমন চিত্র বেশি দেখা যাচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অনেক অটোরিকশা চালক কোনো ধরনের নিয়ম মানছেন না। ব্যস্ত সড়কের মাঝখানে হঠাৎ থেমে যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে যানজট তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে দ্রুতগতিতে চলা ও ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওভারটেক করার ফলে দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়ছে।
মোটরবাইক চালক জুয়েল রানা বলেন, “অটোরিকশা চালকদের কোনো লাইসেন্স নেই, গাড়ির নম্বরও নেই। তবু তারা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। দ্রুত একটা নির্দিষ্ট নিয়মে না আনলে এই সমস্যা কমবে না।” একই ধরনের উদ্বেগ জানিয়েছেন পথচারী ও ব্যাংক কর্মকর্তা রাফায়েল হাসান। তিনি বলেন, “প্রতিদিন রাস্তা পার হতে ভয় লাগে। হঠাৎ কোথা থেকে অটোরিকশা এসে ধাক্কা দেবে বোঝা যায় না। কিছুদিন আগে আফতাবনগরে আমার গাড়ির সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছিল।”
সম্প্রতি ঘটে যাওয়া একটি দুর্ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করেছে। গত ১৭ এপ্রিল শ্যামপুর এলাকায় একটি অটোরিকশায় ওড়না পেঁচিয়ে গলায় ফাঁস লেগে পিংকি খাতুন নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। এ ধরনের ঘটনা সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, অটোরিকশা নিয়ে এখনো কোনো পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা নেই। ফলে আইন প্রয়োগ করাও কঠিন হয়ে পড়ছে। তার মতে, সড়কের ধারণক্ষমতার তুলনায় অনেক বেশি অটোরিকশা চলছে, যা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। তিনি বলেন, দ্রুত নীতিমালা করে নির্দিষ্ট রুট, গতিসীমা এবং চালকদের প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করা জরুরি।
যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হকও একই কথা বলেন। তার মতে, অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাপ্তবয়স্ক কিশোররা অটোরিকশা চালাচ্ছে, যাদের সড়ক নিরাপত্তা সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান নেই। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বেড়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, শুধু আংশিক নয়, পুরো রাজধানীকে মাথায় রেখে একটি সমন্বিত নীতিমালা দরকার, যেখানে চালক, মালিক ও যাত্রী—সব পক্ষের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, অটোরিকশা নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বর্তমানে রাস্তায় চলা বেশিরভাগ অটোরিকশাই মানসম্মত নয়। অনেকগুলো গ্যারেজে তৈরি, যেগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা দুর্বল। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে সঠিক ব্রেকিং সিস্টেমও নেই। সংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন, উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি নিরাপদ অটোরিকশা চালু করা গেলে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব।
এ প্রসঙ্গে জানা গেছে, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি একটি উন্নত মডেল নিয়ে আগে পাইলট প্রকল্প চালু হয়েছিল। দক্ষিণ সিটির ঝিগাতলা ও উত্তর সিটির আফতাবনগরে পরীক্ষামূলকভাবে তা চালানো হয়। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সেই উদ্যোগ থেমে যায়। এরপর থেকে বাজারে অনিয়ন্ত্রিতভাবে নিম্নমানের অটোরিকশা ছড়িয়ে পড়ে।
পটভূমি হিসেবে বলা যায়, ঢাকায় যানজট ও সড়ক বিশৃঙ্খলা নতুন কোনো সমস্যা নয়। গত এক দশকে যানবাহনের সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে, কিন্তু সড়কের পরিমাণ ততটা বাড়েনি। ফলে নতুন ধরনের যানবাহন যুক্ত হলে তা আরও চাপ তৈরি করে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা মূলত পরিবেশবান্ধব হলেও, সঠিক নিয়ন্ত্রণ না থাকলে তা বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
সড়ক পরিবহন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রধান প্রধান সড়কে ধাপে ধাপে অটোরিকশা প্রবেশ নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলোচনা চলছে, যাতে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান বের করা যায়।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এমন জায়গায় পৌঁছেছে যেখানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। একদিকে নগরবাসীর নিরাপত্তা, অন্যদিকে চালকদের জীবিকা—দুটোকেই গুরুত্ব দিয়ে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা তৈরি করা জরুরি। তা না হলে রাজধানীর সড়কে দুর্ঘটনা ও বিশৃঙ্খলা আরও বাড়তে পারে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর