প্রিন্ট এর তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ২২ এপ্রিল ২০২৬
ঢামেক নিউরোসার্জারিতে অপারেশনের অপেক্ষায় ৩০০ রোগী, শয্যার চেয়ে দ্বিগুণ ভর্তি
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নিউরোসার্জারি বিভাগে অপারেশনের অপেক্ষায় রয়েছেন ৩০০–এর বেশি রোগী। শয্যার তুলনায় রোগীর সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হওয়ায় অনেককেই দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জরুরি রোগীর স্বজনদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ আর অনিশ্চয়তা
নাটোর থেকে আসা সুমন হোসেন দাঁড়িয়ে ছিলেন বহির্বিভাগের টিকিট হাতে। তাঁর ভাইয়ের ব্রেন টিউমার দ্রুত অপারেশন করা দরকার। প্রথমে আগারগাঁওয়ের নিউরোসায়েন্সস হাসপাতালে নেওয়া হলেও সেখানে শয্যা না থাকায় ঢামেকে পাঠানো হয়। কিন্তু এখানেও একই অবস্থা। তবু মেঝেতে রাখলেও যেন চিকিৎসা শুরু হয়—এই আশাতেই অপেক্ষা করছেন তিনি। রোগীর চোখে ঝাপসা দেখা এবং মানুষ চিনতে না পারার মতো উপসর্গ দেখা দেওয়ায় পরিবারটি ভীষণ দুশ্চিন্তায় আছে।
ঢামেকের নিউরোসার্জারি বিভাগের আবাসিক সার্জন ডা. মো. আশিক এহসান জানান, বিভাগে ৩০০টি শয্যার বিপরীতে বর্তমানে ভর্তি আছেন প্রায় ৬২০ জন রোগী। চারটি অপারেশন থিয়েটারে ২৪ ঘণ্টা অপারেশন চললেও রোগীর চাপ কমছে না। গত এক বছরে এই বিভাগে ৭ হাজারের বেশি অপারেশন হয়েছে। তারপরও অপারেশনের জন্য অনেক রোগীকে দেড় থেকে দুই মাস পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
দেশের সবচেয়ে বড় সরকারি হাসপাতাল হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় ১১ হাজার রোগী এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ ২ হাজার ৬০০ শয্যার হাসপাতালে ভর্তি থাকেন প্রায় ৪ হাজার রোগী। ফলে ওয়ার্ড ছাড়িয়ে বারান্দা, করিডর, এমনকি র্যাম্পেও রোগীদের থাকতে হচ্ছে। গরম ও বাতাসের অভাবে এসব জায়গায় থাকা রোগীদের কষ্ট আরও বাড়ছে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, জরুরি বিভাগের ঢালু র্যাম্পেও সারি সারি রোগী শুয়ে আছেন। অনেকের পাশে স্যালাইন ঝুলছে লোহার গ্রিলে। রোগীর স্বজনরা বাড়ি থেকে ছোট ফ্যান এনে বাতাস করার চেষ্টা করছেন। এমন পরিবেশে সংক্রমণের ঝুঁকিও বাড়ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।
টাঙ্গাইলের সোবহান প্রামাণিক নামের এক রোগী কাঁধে টিউমার নিয়ে দেড় মাস হাসপাতালে ভর্তি থাকার পর অপারেশন করাতে পেরেছেন। অপারেশনের পরও করিডরেই থাকতে হয়েছে তাঁকে। পাশ দিয়ে মানুষ জুতা পরে চলাফেরা করছে, একই জায়গায় খাবার খাওয়া হচ্ছে—এসব কারণে সংক্রমণের আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
অন্যদিকে মাতুয়াইলের ১২ বছরের সিয়াম মাথায় আঘাত পেয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়। তাঁর মা জানান, অপারেশন ঠিকভাবে হলেও প্রয়োজনীয় বেশিরভাগ ওষুধ বাইরে থেকে কিনতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতাল হলেও সব ওষুধ পাওয়া যায় না—এমন অভিযোগ অনেক স্বজনই করেছেন।
ঢামেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামান বলেন, দেশের শেষ ভরসা হিসেবে রোগীরা এখানে আসেন, তাই কাউকে ফিরিয়ে দেওয়া হয় না। বর্তমানে হাসপাতালে প্রায় ৭০০ জন চিকিৎসক, রেসিডেন্ট, ইন্টার্ন, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করছেন। তবে বড় সমস্যা হচ্ছে অ্যানেসথেসিওলজিস্টের সংকট। ৪৭টি অপারেশন থিয়েটার থাকলেও পর্যাপ্ত অ্যানেসথেসিওলজিস্ট না থাকায় সবগুলো পুরো সময় চালু রাখা যাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ৫৫ জন অ্যানেসথেসিওলজিস্ট রয়েছেন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ আরও জানিয়েছে, দালাল চক্র একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আইসিইউ বা বিভিন্ন পরীক্ষার সীমাবদ্ধতার সুযোগ নিয়ে দালালরা রোগীদের বাইরে নিয়ে যায়। সম্প্রতি যৌথ বাহিনীর অভিযানে ২১ জন দালালকে আটক করা হয়েছে। এর আগে আরও প্রায় ৭০ জনকে ধরা হয়েছিল। কিন্তু জামিনে বেরিয়ে অনেকেই আবার একই কাজে জড়িয়ে পড়ছে।
চানখাঁরপুল ও বকশী বাজার এলাকায় হাসপাতালের আশপাশে গড়ে ওঠা অসংখ্য ছোট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে ঘিরে এই দালাল চক্র সক্রিয় রয়েছে। জানা গেছে, রোগী বেসরকারি হাসপাতালে নিতে পারলে দালালরা ২০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন পায়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, হাসপাতালের সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানে কাজ শুরু হয়েছে। চিকিৎসক সংকট কমাতে ছুটিতে বা লিয়েনে থাকা প্রায় এক হাজার চিকিৎসককে দ্রুত কাজে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢামেক শুধু ঢাকার নয়, সারা দেশের মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা কেন্দ্র। তাই এখানে শয্যা বাড়ানো, অপারেশন থিয়েটার পুরোপুরি চালু করা এবং দালাল চক্র নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। এসব সমস্যার দ্রুত সমাধান না হলে রোগীদের ভোগান্তি আরও বাড়তে পারে। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের চলমান উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে পরিস্থিতি ধীরে ধীরে উন্নত হবে—এমন প্রত্যাশাই করছেন রোগী ও স্বজনরা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর