প্রিন্ট এর তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৯ এপ্রিল ২০২৬
শাস্তিমূলক নয়, সহায়ক বাজেট চায় ব্যবসায়ীরা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
আসন্ন ২০২৬–২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট যেন ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর বাড়তি চাপ না বাড়িয়ে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়াতে সহায়ক হয়—এমন প্রত্যাশা জানিয়েছে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর একটি মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এমসিসিআই)। একই সঙ্গে নতুন করদাতাদের উৎসাহিত করতে বছরে মাত্র ১০০ বা ১০০০ টাকার ‘প্রতীকী ন্যূনতম কর’ চালুর প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।রাজধানীর একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘জাতীয় বাজেট ২০২৬–২৭: বেসরকারি খাতের অগ্রাধিকার ও দৃষ্টিভঙ্গি’ শীর্ষক সেমিনারে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন এমসিসিআই সভাপতি কামরান টি রহমান। যৌথভাবে এই সেমিনারের আয়োজন করে এমসিসিআই ও ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ)।সেমিনারে কামরান টি রহমান বলেন, একটি বাস্তবসম্মত ও ভারসাম্যপূর্ণ করনীতি শুধু রাজস্ব বাড়াতেই সহায়তা করে না, বরং নতুন বিনিয়োগ আকৃষ্ট করা, ব্যবসার পরিধি বাড়ানো এবং কর্মসংস্থান তৈরিতেও বড় ভূমিকা রাখে। তাই বাজেট এমন হওয়া উচিত, যাতে ব্যবসায়ীরা উৎসাহ পান এবং নতুন উদ্যোক্তারাও সামনে এগিয়ে আসেন।তিনি জানান, কর ব্যবস্থাকে আরও সহজ করতে এনআইডি ও টিআইএন ডাটাবেজ পুরোপুরি একীভূত করা জরুরি। এতে নতুন করদাতাদের নিবন্ধন সহজ হবে এবং কর নিয়ে ভীতি অনেকটাই কমবে। পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে সহজে রিটার্ন দাখিলের ব্যবস্থা চালু করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।কর ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক করতে আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমসের জন্য আলাদা আলাদা পোর্টালের পরিবর্তে একটি ‘ইউনিফাইড করদাতা প্রোফাইল’ চালুর প্রস্তাব দেন এমসিসিআই সভাপতি। তার মতে, এতে প্রশাসনিক জটিলতা কমবে এবং ব্যবসায়ীদের সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হবে। অনলাইন শুনানি ও ডিজিটাল নোটিশ ব্যবস্থা চালু হলে করদাতাদের হয়রানিও কমবে।করপোরেট কর কমানো হলেও নগদ লেনদেন সংক্রান্ত কঠোর শর্তের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান এই সুবিধা পাচ্ছে না বলে অভিযোগ তুলে এই শর্ত বাতিলের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে তালিকাভুক্ত ও অ-তালিকাভুক্ত কোম্পানির করহার আরও ২ দশমিক ৫ শতাংশ কমানোর প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যাতে নতুন বিনিয়োগ বাড়ে।এছাড়া বর্তমানে ৩৯টি ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিলের প্রমাণপত্র বাধ্যতামূলক হওয়াকে ব্যবসা সহজীকরণের পথে বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। আয়কর আইন ২০২৩–এর কিছু ধারা বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলেও মত দেয় এমসিসিআই।ভ্যাট ও কাস্টমস ব্যবস্থাকে আরও সহজ করার ওপরও জোর দেওয়া হয়। ব্যবসায়িক গোপনীয়তা রক্ষায় মুসক ৪.৩ ফরমে মূল্যমানের পরিবর্তে শুধু পরিমাণ উল্লেখের সুযোগ রাখার প্রস্তাব করা হয়। একই সঙ্গে প্রকৃত লেনদেন মূল্যের ভিত্তিতে শুল্ক নির্ধারণ এবং কাস্টমস ব্যবস্থায় অটোমেশন বাড়ানোর কথাও বলা হয়।ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতকে দেশের অর্থনীতির প্রাণ হিসেবে উল্লেখ করে এ খাতের জন্য পৃথক করহার ও ইনপুট ট্যাক্স ক্রেডিট সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়। কাঁচামালের ওপর শুল্ক ও ভ্যাট কমানো হলে দেশীয় শিল্প আরও শক্তিশালী হবে বলে মনে করেন ব্যবসায়ীরা।সেমিনারে ইআরএফ সভাপতি দৌলত আখতার মালা বলেন, বর্তমানে দেশের অর্থনীতি নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে। জ্বালানি সংকট, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সঙ্গে আলোচনা এবং দুর্বল বিনিয়োগ পরিস্থিতির কারণে রাজস্ব আদায়ে চাপ তৈরি হয়েছে। চলতি অর্থবছরে প্রায় এক লাখ কোটি টাকার মতো রাজস্ব ঘাটতি হতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।তিনি বলেন, রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হলে সাধারণত বিদ্যমান করদাতাদের ওপর চাপ বাড়ে। এতে ব্যবসায়ীরা নিরুৎসাহিত হন এবং নতুন করদাতারা কর ব্যবস্থার বাইরে থাকতে চান। তাই করের আওতা বাড়াতে সম্পদধারী কিন্তু কর না দেওয়া ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নিতে হবে।ডাটা স্বচ্ছতার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, সরকার যে তথ্য প্রকাশ করবে তা যেন নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য হয়। করদাতাদের আস্থা তখনই বাড়বে, যখন তারা দেখবেন তাদের দেওয়া কর দেশের উন্নয়নেই ব্যয় হচ্ছে।উল্লেখ্য, এমসিসিআই দেশের অন্যতম প্রাচীন ব্যবসায়ী সংগঠন, যা দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় বাজেট প্রণয়নের আগে বেসরকারি খাতের মতামত তুলে ধরে আসছে। অন্যদিকে ইআরএফ অর্থনীতি বিষয়ক সাংবাদিকদের সংগঠন হিসেবে বাজেট নিয়ে নিয়মিত আলোচনা ও বিশ্লেষণ করে থাকে।সব মিলিয়ে সেমিনারে অংশ নেওয়া বক্তারা মনে করেন, আগামী বাজেট যদি ব্যবসাবান্ধব ও বাস্তবমুখী হয়, তাহলে বিনিয়োগ বাড়বে, কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং সামগ্রিক অর্থনীতিও নতুন গতি পাবে—এটাই এখন বেসরকারি খাতের প্রধান প্রত্যাশা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর