প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ এপ্রিল ২০২৬
জ্বালানি সংকটে থমকে দেশ: অর্ধেকে নেমেছে বাস, তিনগুণ ভাড়া—যাত্রী দুর্ভোগ চরমে
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশজুড়ে চলমান জ্বালানি সংকটের সরাসরি ও মারাত্মক প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। ডিজেলের সরবরাহ ঘাটতির কারণে সড়কে বাস, মিনিবাস, ট্রাকসহ বিভিন্ন যানবাহনের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় গণপরিবহনের চলাচল ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ায় যাত্রীদের ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করেছে।অফিস শুরুর সময় এবং ছুটির পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠছে। বাসের জন্য দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করেও অনেক যাত্রী পরিবহন পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে অনেকে রিকশা বা রাইড শেয়ারিং সেবার দিকে ঝুঁকছেন, যার ফলে তাদের দৈনন্দিন যাতায়াত ব্যয় কয়েকগুণ বেড়ে গেছে।রাজধানীর বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ড ঘুরে দেখা গেছে, যাত্রীরা দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন। আগে যেখানে ৫–১০ মিনিটের মধ্যে বাস পাওয়া যেত, এখন সেখানে আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টার বেশি সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত ভাড়া না দিলে বাসে ওঠাও কঠিন হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন।দূরপাল্লার পরিবহনেও সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক পরিবহন সংস্থা তাদের নির্ধারিত ট্রিপ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে জেলা-জেলা যোগাযোগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে, অনেকেই টিকিট না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন।পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে, জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার কারণে যানবাহন চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আগে একবার তেল নিয়ে একটি ট্রিপ সম্পন্ন করা গেলেও এখন একাধিকবার তেল নিতে হচ্ছে। এতে সময় ও খরচ—দুই-ই বেড়ে গেছে। ফলে মালিকরা ট্রিপ সংখ্যা কমিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।এদিকে পণ্য পরিবহন খাতেও সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে। ট্রাক ও কাভার্ডভ্যানের ভাড়া তিনগুণ পর্যন্ত বেড়ে গেছে। আগে যেখানে ঢাকায় পণ্য পরিবহন খরচ ছিল ১৫ হাজার টাকা, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫–৪৮ হাজার টাকায়। একইভাবে দেশের বিভিন্ন রুটে পরিবহন ব্যয় কয়েক হাজার থেকে কয়েক দশ হাজার টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এতে ব্যবসায়ী ও শিল্প খাত চাপে পড়েছে এবং বাজারে পণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।জ্বালানি সংকটের কারণে ব্যক্তিগত গাড়ির ব্যবহারও কমে গেছে। অনেকেই প্রাইভেটকার ব্যবহার না করে গণপরিবহন বা মেট্রোরেলের দিকে ঝুঁকছেন। পেট্রোল পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও তেল না পাওয়ার অভিজ্ঞতায় অনেকেই প্রয়োজন ছাড়া গাড়ি বের করছেন না। ফলে রাজধানীর সড়কে যানজট কিছুটা কমলেও জনদুর্ভোগ বেড়েছে বহুগুণ।নৌপরিবহন খাতেও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট। দেশের বিভিন্ন নৌপথে স্পিডবোট ও ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচল বন্ধ বা সীমিত হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যাত্রীদের কয়েক ঘণ্টা অতিরিক্ত সময় ব্যয় করে গন্তব্যে পৌঁছাতে হচ্ছে। এতে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং নৌপথনির্ভর অর্থনীতিতে বড় ধাক্কা লেগেছে।অন্যদিকে চালকদের দুর্ভোগও বেড়েছে। অনেককে ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লাইনে দাঁড়িয়ে তেল সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে তাদের কাজের সময় বাড়লেও আয় কমে গেছে। বিশ্রামের অভাবে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন।
সব মিলিয়ে, জ্বালানি সংকট দেশের পরিবহন ব্যবস্থা, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় গভীর প্রভাব ফেলছে। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সংকট আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
কপিরাইট © ২০২৫ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর