প্রিন্ট এর তারিখ : ১৩ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১৩ মে ২০২৬
শিশু নির্যাতন ও বলাৎকারের অভিযোগ: আইন কী বলছে, কেন বাড়ছে উদ্বেগ
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও বলাৎকারের অভিযোগ ঘিরে আবারও আলোচনায় এসেছে কিছু আবাসিক মাদরাসা। সাম্প্রতিক সময়ে কয়েকটি ঘটনায় শিশুদের নিরাপত্তা, তদারকি ব্যবস্থা এবং আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে অভিভাবক ও সচেতন মহলে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম থেকে শুরু করে বিভিন্ন নাগরিক প্ল্যাটফর্মে এখন প্রশ্ন উঠছে—শিশুরা আসলে কতটা নিরাপদ?মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর দাবি, যেসব প্রতিষ্ঠানে শিশুদের দীর্ঘ সময় পরিবারের বাইরে থাকতে হয়, সেখানে কঠোর মনিটরিং, স্বচ্ছ প্রশাসন এবং নিয়মিত তদারকি নিশ্চিত না হলে নির্যাতনের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে আবাসিক ব্যবস্থাপনায় থাকা শিশুদের অনেক সময় ভয়, লজ্জা বা সামাজিক চাপে নির্যাতনের কথা প্রকাশ করতে দেরি হয়।তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোনো একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই সব আবাসিক মাদরাসাকে একইভাবে দেখার সুযোগ নেই। অনেক প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে সুনামের সঙ্গে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে। তাই অভিযোগের সঠিক তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুরো ব্যবস্থার সংস্কার নিয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।শিশু নির্যাতন নিয়ে বাংলাদেশের আইন কী বলছেবাংলাদেশে শিশু নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও বলাৎকারের বিরুদ্ধে একাধিক আইন রয়েছে। শিশুদের সুরক্ষায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘শিশু আইন ২০১৩’ এবং ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত)’।আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো শিশুর ওপর শারীরিক নির্যাতন, মানসিক চাপ, যৌন হয়রানি কিংবা বলাৎকারের ঘটনা প্রমাণিত হলে অভিযুক্ত ব্যক্তির বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা শুধু রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়, প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেরও আইনগত ও নৈতিক দায়িত্ব।শিশু আইন অনুযায়ী, কোনো শিশুর প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, অবহেলা বা মানসিক ক্ষতির মতো কর্মকাণ্ডও অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। অন্যদিকে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে বলাৎকারের মতো অপরাধের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধানও রয়েছে।আইনজীবীদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে অভিযোগ তদন্তে বিলম্ব হলে অনেক সময় প্রমাণ নষ্ট হয়ে যায়। তাই এমন ঘটনায় দ্রুত মামলা গ্রহণ, মেডিকেল পরীক্ষা এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।আবাসিক প্রতিষ্ঠানে কেন বাড়ছে ঝুঁকিশিশু অধিকারকর্মীদের ভাষ্য, আবাসিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অনেক শিশু পরিবার থেকে দূরে থেকে পড়াশোনা করে। সেখানে শিক্ষক, সুপারভাইজার বা দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ওপর শিশুদের নির্ভরশীলতা বেশি থাকে। এই অবস্থার সুযোগ নিয়ে কিছু অসাধু ব্যক্তি ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারে বলে অভিযোগ রয়েছে।কিছু ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠেছে, নির্যাতনের শিকার শিশুরা ভয় বা সামাজিক লজ্জার কারণে মুখ খুলতে পারে না। আবার অনেক পরিবারও সামাজিক সম্মানের কথা ভেবে ঘটনা গোপন রাখার চেষ্টা করে। ফলে অপরাধীরা দীর্ঘ সময় ধরা-ছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়।মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, শিশু নির্যাতনের শিকার হলে একটি শিশুর মানসিক বিকাশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তারা আতঙ্ক, হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি মানসিক সমস্যায় ভুগতে পারে। তাই শুধু আইনি ব্যবস্থা নয়, ভুক্তভোগীদের কাউন্সেলিং ও পুনর্বাসনও জরুরি।আবাসিক মাদরাসা বন্ধের দাবি কেন উঠছেসাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযোগের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু নাগরিক ও অধিকারকর্মী আবাসিক মাদরাসা বন্ধের দাবি তুলেছেন। তাদের বক্তব্য, যেসব প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত নজরদারি নেই এবং শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, সেসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।তবে শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, সব আবাসিক মাদরাসাকে দায়ী করা বাস্তবসম্মত নয়। বরং যেসব প্রতিষ্ঠানে অনিয়ম, নির্যাতন বা অপরাধের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। একইসঙ্গে নিবন্ধন, সিসিটিভি মনিটরিং, শিশু সুরক্ষা নীতিমালা, অভিযোগ গ্রহণ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত সরকারি তদারকি বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দিচ্ছেন তারা।ধর্মীয় শিক্ষাবিদদের একাংশও বলছেন, ইসলাম কখনো শিশু নির্যাতন বা অন্যায়ের সমর্থন করে না। তাই ধর্মীয় শিক্ষার পরিবেশকে নিরাপদ ও মানবিক রাখতে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা প্রয়োজন।অভিভাবকদের করণীয় কীবিশেষজ্ঞদের মতে, অভিভাবকদেরও সন্তানদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতে হবে। শিশুর আচরণে হঠাৎ পরিবর্তন, ভয়, আতঙ্ক বা নিরবতা দেখা দিলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই ‘ভালো স্পর্শ’ ও ‘খারাপ স্পর্শ’ সম্পর্কে সচেতন করার পরামর্শও দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।এ ছাড়া কোনো শিশু নির্যাতনের অভিযোগ পেলে তা গোপন না রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিশু সহায়তা সংস্থা বা প্রশাসনের কাছে দ্রুত জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন মানবাধিকারকর্মীরা।রাষ্ট্র ও সমাজের সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বানবিশ্লেষকদের মতে, শিশু নির্যাতনের মতো অপরাধ শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয়। তাই রাজনৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে শিশুদের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।তারা বলছেন, কোনো অভিযোগকে ধামাচাপা না দিয়ে স্বচ্ছ তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে শিশুদের জন্য নিরাপদ শিক্ষা পরিবেশ গড়ে তুলতে সরকার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।বর্তমানে বিভিন্ন মহল থেকে শিশু সুরক্ষা নীতিমালা আরও শক্তিশালী করা, আবাসিক প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত মনিটরিং বৃদ্ধি এবং অপরাধীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবি উঠছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, শিশুদের নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো ধরনের আপসের সুযোগ নেই।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর