প্রিন্ট এর তারিখ : ১২ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১২ মে ২০২৬
চাঁপাইনবাবগঞ্জে এবারও নেই ম্যাংগো ক্যালেন্ডার, পাকা হলেই বিক্রি করা যাবে আম
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি মৌসুমেও থাকছে না ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’। অর্থাৎ নির্দিষ্ট তারিখ বেঁধে না দিয়ে গাছে আম পরিপক্ব হলেই তা বাজারজাত করতে পারবেন চাষিরা। আমচাষিদের দাবি ও স্থানীয় বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসন এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অন্যদিকে নাটোরে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী ১৫ মে থেকে শুরু হচ্ছে আম সংগ্রহ মৌসুম।সোমবার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় এ সিদ্ধান্ত জানানো হয়। সভায় নিরাপদ ও বিষমুক্ত আম উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবহন এবং বাজারজাতকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অপরিপক্ব আম বাজারে এলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।চাষিদের দাবির মুখে বদলালো অবস্থানগত কয়েক বছর ধরে দেশের বিভিন্ন আম উৎপাদনকারী জেলায় ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’ অনুসরণ করা হলেও চাঁপাইনবাবগঞ্জে তা নিয়ে বিতর্ক ছিল। স্থানীয় চাষিদের অভিযোগ, জেলার ভৌগোলিক বৈচিত্র্যের কারণে সব উপজেলায় একই সময়ে আম পাকে না। ফলে এক তারিখে আম সংগ্রহের নির্দেশনা বাস্তবতার সঙ্গে মেলে না।এবারের সভায় সেই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক আবু ছালেহ মো. মুসা জঙ্গীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় কৃষি বিভাগ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, উপজেলা প্রশাসন এবং আমচাষিদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। সভা শেষে জানানো হয়, কোনো নির্দিষ্ট ক্যালেন্ডার ছাড়াই পরিপক্ব আম বাজারে তোলা যাবে।চাষিরা বলছেন, এতে তাদের ক্ষতির আশঙ্কা কমবে। কারণ অনেক সময় নির্ধারিত সময়ের আগেই কিছু এলাকায় আম পেকে যায়, আবার কোথাও দেরিতে পাকে। ক্যালেন্ডার থাকলে অনেককে জোর করে অপেক্ষা করতে হতো বা লোকসানের মুখে পড়তে হতো।একেক এলাকায় একেক সময়ে পাকে আমনাচোল উপজেলার আমচাষি রফিকুল ইসলাম বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের আম আগে পাকলেও শিবগঞ্জ বা ভোলাহাটে একই জাতের আম পাকতে আরও কয়েকদিন সময় লাগে। এক নিয়মে পুরো জেলা চালানো কঠিন।তার ভাষায়, “আগে ক্যালেন্ডারের কারণে অনেক সময় পাকা আম গাছেই নষ্ট হওয়ার শঙ্কা থাকত। আবার কোথাও অপরিপক্ব আম নামিয়ে বাজারে দিতে হতো। এবার সেই সমস্যা থাকবে না।”শিবগঞ্জের আরেক চাষি আব্দুল মান্নান বলেন, এই অঞ্চলের অনেক চাষি একটু দেরিতে আম ভাঙেন। কারণ মৌসুমের শেষ দিকে বাজারে দাম তুলনামূলক বেশি থাকে। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিলে সেই সুযোগ নষ্ট হতো বলে দাবি করেন তিনি।চাষিদের মতে, প্রশাসনের এ সিদ্ধান্ত তাদের ব্যবসায়িক স্বাধীনতা বাড়াবে। তবে একই সঙ্গে তারা বাজারে ভেজাল বা কেমিক্যালযুক্ত আম ঠেকাতে নজরদারি জোরদারেরও দাবি জানিয়েছেন।অপরিপক্ব আম বিক্রি ঠেকাতে কঠোর অবস্থানসভায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে, ক্যালেন্ডার না থাকলেও অপরিপক্ব আম বিক্রি করলে ছাড় দেওয়া হবে না। কোনো অসাধু ব্যবসায়ী যাতে কাঁচা আম বাজারে তুলে ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করতে না পারে, সে জন্য মাঠপর্যায়ে অভিযান চালানো হবে।কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে বাজারে নিরাপদ খাদ্য নিয়ে মানুষের সচেতনতা বেড়েছে। তাই আমে কেমিক্যাল বা ক্ষতিকর উপাদান ব্যবহার বন্ধে নজরদারি অব্যাহত থাকবে।সভায় উপস্থিত কর্মকর্তারা বলেন, আম দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌসুমি ফল। বিশেষ করে চাঁপাইনবাবগঞ্জের অর্থনীতির বড় অংশ নির্ভর করে আমের ওপর। ফলে বাজারে আস্থা ধরে রাখতে মানসম্মত আম সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।আম পরিবহনে নতুন পরিকল্পনাআম পরিবহন নিয়েও সভায় বেশ কিছু সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। আগের মতো আলাদা ‘ম্যাংগো স্পেশাল ট্রেন’ না চালিয়ে আন্তঃনগর বনলতা এক্সপ্রেসে একটি বিশেষ বগি সংযুক্ত করার পরিকল্পনার কথা উঠে আসে। এতে দ্রুত সময়ের মধ্যে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় আম পৌঁছে দেওয়া সহজ হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।এ ছাড়া ডাক বিভাগের মাধ্যমে আম পরিবহন আরও সক্রিয় করা এবং কুরিয়ার সার্ভিসগুলোর অব্যবস্থাপনা কমানোর উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।চাষিদের অভিযোগ, অনেক সময় পরিবহনে দেরি হওয়ায় আম নষ্ট হয়ে যায়। বিশেষ করে গরমের সময়ে দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে ব্যবসায়ীরা বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন তারা।উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রাও বেড়েছেচাঁপাইনবাবগঞ্জে এবার প্রায় ৪ লাখ ৫৮ হাজার ৯১২ মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া থাকলে উৎপাদন আরও বাড়তে পারে। তবে অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ, ঝড় কিংবা শিলাবৃষ্টি বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে বলেও আশঙ্কা রয়েছে।চাষিরা জানান, উৎপাদন বাড়লেও বাজারদর স্থিতিশীল রাখা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ মৌসুমের শুরুতে দাম বেশি থাকলেও একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ আম বাজারে এলে দাম কমে যায়।নাটোরে থাকছে নির্দিষ্ট সময়সূচিচাঁপাইনবাবগঞ্জের বিপরীতে নাটোরে এবারও থাকছে নির্ধারিত ‘ম্যাংগো ক্যালেন্ডার’। জেলা প্রশাসনের সভায় জানানো হয়েছে, ১৫ মে থেকে গুটি আম সংগ্রহ শুরু হবে। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন জাতের আম বাজারজাতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।২৫ মে থেকে গোপালভোগ, ৩০ মে থেকে রাণীপছন্দ ও ক্ষিরসাপাত, ১৫ জুন থেকে ল্যাংড়া ও আম্রপালি এবং পরে পর্যায়ক্রমে ফজলি, মল্লিকা, আশ্বিনা ও গৌরমতি আম বাজারে আসবে।জেলা প্রশাসক আসমা শাহীন বলেন, নিরাপদ ফল নিশ্চিত করতে প্রশাসন কঠোর নজরদারিতে থাকবে। নির্ধারিত সময়ের আগে আম নামিয়ে বাজারজাত করলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করেন।সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব কী হতে পারেবিশেষজ্ঞদের মতে, চাঁপাইনবাবগঞ্জে ম্যাংগো ক্যালেন্ডার না রাখার সিদ্ধান্ত স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও এর সফলতা অনেকটাই নির্ভর করবে নজরদারির ওপর। কারণ নির্দিষ্ট সময়সীমা না থাকলে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী আগেভাগে অপরিপক্ব আম বাজারে ছাড়ার চেষ্টা করতে পারেন।অন্যদিকে চাষিরা মনে করছেন, এই সিদ্ধান্ত তাদের আর্থিক ক্ষতি কমাবে এবং বাজার পরিস্থিতি বুঝে আম বিক্রির সুযোগ দেবে। এতে কৃষকের লাভ বাড়তে পারে। তবে ভোক্তার আস্থা ধরে রাখতে নিরাপদ ও প্রাকৃতিকভাবে পাকা আম নিশ্চিত করা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।শেষ কথা
দেশের আম অর্থনীতিতে চাঁপাইনবাবগঞ্জের গুরুত্ব অনেক পুরোনো। তাই এ জেলার আম সংগ্রহ ও বাজারজাতকরণ নিয়ে নেওয়া যেকোনো সিদ্ধান্তের প্রভাব পড়ে জাতীয় বাজারেও। এবার ক্যালেন্ডার না থাকলেও প্রশাসন বলছে, ভোক্তার নিরাপত্তা ও কৃষকের স্বার্থ—দুই দিকই গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে। এখন দেখার বিষয়, মাঠপর্যায়ে সেই ভারসাম্য কতটা বজায় রাখা সম্ভব হয়।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর