প্রিন্ট এর তারিখ : ১১ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ১১ মে ২০২৬
ইরাকের মরুভূমিতে ‘গোপন ইসরায়েলি ঘাঁটি’ নিয়ে তোলপাড়, সূত্রের দাবি—মেষপালকের তথ্যেই ফাঁস
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ইরাকের পশ্চিমাঞ্চলের দুর্গম মরুভূমিতে ইসরায়েলের একটি গোপন সামরিক ঘাঁটি ছিল—এমন দাবি ঘিরে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Wall Street Journal–এর এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের ভেতরে অভিযান চালানোর সহায়তায় ওই ঘাঁটি ব্যবহার করত ইসরায়েলি বাহিনী। আর পুরো বিষয়টি সামনে আসে এক স্থানীয় মেষপালকের সন্দেহজনক তৎপরতা নজরে আসার পর।প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, গত মার্চ মাসের শুরুতে ওই মেষপালক ইরাকের নির্জন মরুভূমি এলাকায় অস্বাভাবিক হেলিকপ্টার চলাচল এবং সামরিক ধরনের কর্মকাণ্ড দেখতে পান। পরে তিনি বিষয়টি স্থানীয় নিরাপত্তা বাহিনীকে জানান। এরপর ইরাকি সেনারা এলাকায় অভিযান চালাতে গেলে পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।অভিযোগ রয়েছে, ওই অভিযানের সময় ইসরায়েল নিজেদের গোপন উপস্থিতি আড়াল করতে আকাশপথে হামলা চালায়। এতে অন্তত একজন ইরাকি সেনা নিহত হন বলে দাবি করা হয়েছে। যদিও সে সময় বাগদাদ আনুষ্ঠানিকভাবে হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছিল এবং বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও অভিযোগ তোলে। কিন্তু নতুন এই প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, প্রকৃত লক্ষ্য ছিল ওই এলাকায় অবস্থানরত ইসরায়েলি কমান্ডোদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া।কী কাজে ব্যবহার হতো কথিত এই ঘাঁটিপ্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, মরুভূমির ওই স্থাপনাটি মূলত একটি “লজিস্টিক হাব” হিসেবে ব্যবহৃত হতো। অর্থাৎ এটি সরাসরি বড় সামরিক ঘাঁটি না হয়ে অভিযান পরিচালনা ও সহায়তা কেন্দ্র হিসেবে কাজ করত।সূত্রগুলোর দাবি, সেখানে ইসরায়েলের বিশেষ বাহিনীর সদস্যদের পাশাপাশি উদ্ধারকারী ইউনিটও মোতায়েন ছিল। বিশেষ করে ইরানের আকাশসীমার ভেতরে অভিযান চালানোর সময় কোনো যুদ্ধবিমান ক্ষতিগ্রস্ত হলে বা পাইলট বিপদে পড়লে দ্রুত উদ্ধার অভিযান পরিচালনার জন্য এই ঘাঁটি প্রস্তুত রাখা হয়েছিল।মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানকে ঘিরে ইসরায়েলের কৌশল আরও আক্রমণাত্মক হয়েছে। সাইবার হামলা, গোপন অভিযান এবং লক্ষ্যভিত্তিক আঘাতের পাশাপাশি আঞ্চলিক সমন্বয়ও বাড়িয়েছে তেল আবিব। ফলে ইরাকের মতো কৌশলগত এলাকায় গোপন তৎপরতার অভিযোগ পুরোপুরি নতুন নয়।যুক্তরাষ্ট্র জানত কি না, তা নিয়েও প্রশ্নপ্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, এই গোপন ঘাঁটি স্থাপনের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের অজানা ছিল না। বরং মার্কিন প্রশাসনের জ্ঞাতসারেই এটি পরিচালিত হচ্ছিল বলে সূত্রের বরাতে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।অন্যদিকে ইরাকি সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা প্রতিবেদনের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তার ভাষ্য, ইরাকের ভেতরে ইসরায়েলের এমন কোনো সামরিক ঘাঁটির অস্তিত্বের তথ্য তাদের কাছে নেই।তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, অঞ্চলটির জটিল নিরাপত্তা বাস্তবতায় অনেক সময় বিভিন্ন দেশ আনুষ্ঠানিকভাবে সংবেদনশীল কার্যক্রম অস্বীকার করে থাকে। বিশেষ করে ইরান-ইসরায়েল উত্তেজনার মতো বিষয়ে সরাসরি অবস্থান নেওয়া অনেক রাষ্ট্রের জন্য কূটনৈতিকভাবে অস্বস্তিকর হয়ে দাঁড়ায়।মরুভূমির নীরবতা ভাঙল এক রাখালের সন্দেহঘটনার সবচেয়ে আলোচিত অংশ হয়ে উঠেছেন সেই অজ্ঞাত পরিচয়ের মেষপালক। স্থানীয় সূত্রের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে ওই এলাকায় পশু চরানোর কারণে তিনি মরুভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ সম্পর্কে ভালোভাবেই জানতেন। তাই হঠাৎ করে হেলিকপ্টারের ওঠানামা এবং সশস্ত্র লোকজনের উপস্থিতি তার নজর এড়ায়নি।নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, আধুনিক প্রযুক্তি ও গোয়েন্দা নজরদারির যুগেও অনেক সময় স্থানীয় মানুষের পর্যবেক্ষণ বড় ধরনের গোপন কর্মকাণ্ড সামনে এনে দেয়। ইতিহাসে এমন বহু ঘটনার নজির রয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের সন্দেহ থেকেই গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা তথ্য প্রকাশ পেয়েছে।মধ্যপ্রাচ্যে বাড়ছে নতুন উদ্বেগএই প্রতিবেদন সামনে আসার পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের অনেকে মনে করছেন, যদি দাবিগুলো সত্য হয়, তাহলে তা ইরাকের সার্বভৌমত্ব নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলতে পারে। একই সঙ্গে এটি ইরান-ইসরায়েল ছায়াযুদ্ধ আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিতও দিতে পারে।বর্তমানে ইরাকের ভেতরে বিভিন্ন বিদেশি প্রভাব নিয়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা আগে থেকেই রয়েছে। এর মধ্যে নতুন করে ইসরায়েলি গোপন ঘাঁটির অভিযোগ দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।অন্যদিকে ইসরায়েল বরাবরের মতোই এ ধরনের গোপন সামরিক অভিযান নিয়ে প্রকাশ্যে খুব কম মন্তব্য করে। ফলে এই প্রতিবেদনের সত্যতা পুরোপুরি যাচাই করা এখনও সম্ভব হয়নি। তবে ঘটনাটি ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মহলে ব্যাপক কৌতূহল ও উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।তদন্ত ও কূটনৈতিক চাপের সম্ভাবনাএখন পর্যন্ত ইরাক, ইসরায়েল কিংবা যুক্তরাষ্ট্র—কোনো পক্ষই বিস্তারিত আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেয়নি। ফলে বিষয়টি এখনও আংশিকভাবে দাবি ও পাল্টা দাবির মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে।তবে কূটনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরাকি সংসদ বা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সংস্থাগুলো ভবিষ্যতে বিষয়টি নিয়ে তদন্তের দাবি তুলতে পারে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরাও ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে আগ্রহ দেখাতে পারেন।
যদি অভিযোগের পক্ষে আরও তথ্য সামনে আসে, তাহলে মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান উত্তেজনা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর