প্রিন্ট এর তারিখ : ০৬ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০৬ মে ২০২৬
কুতুবদিয়ায় নোঙর ‘এমটি নিনেমিয়া’: এক লাখ টন ক্রুডে জ্বালানি সরবরাহে স্বস্তির আশা
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন গতি আনতে সৌদি আরব থেকে আনা এক লাখ টন ক্রুড অয়েল নিয়ে ট্যাংকার জাহাজ ‘এমটি নিনেমিয়া’ কুতুবদিয়া অ্যাংকরে পৌঁছেছে। বুধবার (৬ মে) দুপুর সোয়া ১২টার দিকে জাহাজটি নোঙর করার পর থেকেই সংশ্লিষ্ট মহলে দেখা দিয়েছে স্বস্তির আভাস। দ্রুত আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিকেলেই শুরু হতে পারে ক্রুড লাইটারিং কার্যক্রম।কুতুবদিয়ায় জাহাজ ভেড়ানো: কী ঘটছে এখনবাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, কাস্টমস এবং সার্ভেয়ার কোম্পানির প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলেই মূল কার্যক্রম শুরু হবে।বন্দর সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আজ বিকেল থেকেই লাইটারিং শুরু হবে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কাজ দ্রুত শেষ করার চেষ্টা চলছে।”লাইটারিং বলতে বড় ট্যাংকার থেকে ছোট জাহাজে ক্রুড অয়েল স্থানান্তর করে তা রিফাইনারিতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়াকে বোঝানো হয়। কুতুবদিয়া উপকূলে এই কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরেই পরিচালিত হয়ে আসছে।ইস্টার্ন রিফাইনারি চালুতে আশার আলোইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডের (ইআরএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী শরীফ হাসনাত জানিয়েছেন, এই চালান সময়মতো খালাস করা গেলে বন্ধ থাকা প্ল্যান্ট পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে।তিনি বলেন, “আমরা আশা করছি, বৃহস্পতিবার (৭ মে) থেকেই রিফাইনারির কার্যক্রম আবার শুরু করা যাবে। এতে জ্বালানি সরবরাহে যে চাপ তৈরি হয়েছিল, তা কিছুটা হলেও কমবে।”জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কাঁচা তেলের সরবরাহে বিঘ্নের কারণে রিফাইনারির একটি প্ল্যান্ট বন্ধ রাখতে হয়েছিল, যা দেশের জ্বালানি ব্যবস্থায় চাপ তৈরি করে।সামনে আসছে আরও একটি বড় চালানশুধু ‘এমটি নিনেমিয়া’ নয়, আরও একটি বড় চালান আসছে শিগগিরই। ফুজাইরা থেকে ‘এমটি ফসিল’ নামের আরেকটি ট্যাংকার জাহাজে করে আরও এক লাখ টন ক্রুড আনার প্রস্তুতি চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাহাজটি ১১ মে বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা রয়েছে।এ বিষয়ে এক জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বলেন, “একাধিক চালান ধারাবাহিকভাবে এলে সরবরাহ চেইন স্থিতিশীল থাকবে। এতে বাজারে তেলের চাপ কমবে এবং আমদানি ব্যবস্থাও সুসংহত হবে।”আমদানিনির্ভর জ্বালানি খাত: বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জবাংলাদেশের একমাত্র পেট্রোলিয়াম রিফাইনারি ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল), যা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মালিকানাধীন। এই রিফাইনারির জন্য প্রয়োজনীয় শতভাগ ক্রুড অয়েল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।সরকার সাধারণত জি-টু-জি (সরকার থেকে সরকার) পদ্ধতিতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে এই তেল আমদানি করে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারের ওপর নির্ভরতা বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচিত হয়।একজন অর্থনীতিবিদ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “বিশ্ববাজারে দামের ওঠানামা সরাসরি আমাদের ওপর প্রভাব ফেলে। তাই সময়মতো আমদানি নিশ্চিত করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”পরিবহন ব্যবস্থাপনায় বিএসসির ভূমিকাআমদানি করা ক্রুড অয়েলের পুরো পরিবহন কার্যক্রম পরিচালনা করে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি)। বর্তমানে মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘নর্ডিক এনার্জি’ থেকে চার্টারে জাহাজ ভাড়া নিয়ে এই কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।বিএসসি সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, “নিজস্ব বহর শক্তিশালী করা গেলে খরচ কমানো সম্ভব হবে। তবে আপাতত চার্টার ভিত্তিক ব্যবস্থাই নির্ভরযোগ্য সমাধান হিসেবে কাজ করছে।”স্থানীয়দের দৃষ্টিভঙ্গিকুতুবদিয়া এলাকার কিছু বাসিন্দা জানান, বড় জাহাজ ভেড়ার সময় এলাকায় কর্মচাঞ্চল্য বাড়ে। তবে পরিবেশগত বিষয়েও তারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।একজন স্থানীয় জেলে বলেন, “জাহাজ আসলে আমাদের কিছু কাজের সুযোগ হয়। কিন্তু তেল ছড়িয়ে পড়ার ভয়ও থাকে। প্রশাসন যেন এই বিষয়টা গুরুত্ব দেয়।”এই অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।প্রভাব ও বিশ্লেষণএই চালান দেশের জ্বালানি খাতে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শিল্প খাত, বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং পরিবহন ব্যবস্থায় জ্বালানির স্থিতিশীল সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি।বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত ও পরিকল্পিত আমদানির মাধ্যমে জ্বালানি সংকট এড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে বিকল্প জ্বালানি উৎসের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।প্রশাসনের করণীয়জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও দক্ষতা বাড়াতে প্রশাসনের আরও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে—
সময়মতো আমদানির পরিকল্পনা করা
পরিবহন ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধি
পরিবেশগত ঝুঁকি কমাতে নজরদারি জোরদার
এ বিষয়ে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, “আমরা সব দিক বিবেচনায় নিয়ে কাজ করছি। সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।”উপসংহার
কুতুবদিয়ায় ‘এমটি নিনেমিয়া’র আগমন দেশের জ্বালানি খাতে এক ধরনের স্বস্তির বার্তা নিয়ে এসেছে। সামনে আরও চালান আসার সম্ভাবনা থাকায় সরবরাহ পরিস্থিতি উন্নত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। তবে দীর্ঘমেয়াদে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিকল্পিত উদ্যোগ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বিকল্প উৎসের দিকে নজর দেওয়াই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর