প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
ইরানে অবিস্ফোরিত বোমা নিষ্ক্রিয় করতে গিয়ে বিস্ফোরণ, নিহত ১৪—নিরাপত্তা ব্যবস্থায় প্রশ্ন
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
ইন্ট্রো:
ইরানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে একটি ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে ভয়াবহ দুর্ঘটনা ঘটেছে। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ নিষ্ক্রিয় করার সময় বিস্ফোরণে ইসলামি রেভ্যলুশনারি গার্ড কোরের (আইআরজিসি) ১৪ সদস্য নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও অন্তত দুইজন। ঘটনাটি নতুন করে সামনে এনেছে যুদ্ধোত্তর অবিস্ফোরিত অস্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি।কী ঘটেছে জানজান প্রদেশেশনিবার ইরানের জানজান প্রদেশে চলমান একটি নিষ্ক্রিয়করণ অভিযানের সময় হঠাৎ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানা গেছে, একটি বিশেষায়িত ইউনিট ওই এলাকায় ছড়িয়ে থাকা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয় করার কাজ করছিল।অভিযানের এক পর্যায়ে একটি গোলাবারুদ অপ্রত্যাশিতভাবে বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই ১৪ জন সদস্য নিহত হন। আহত দুইজনকে দ্রুত নিকটবর্তী হাসপাতালে নেওয়া হয়, তবে তাদের অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু জানা যায়নি।সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, এটি একটি “অপারেশনাল দুর্ঘটনা”, যেখানে উচ্চ ঝুঁকির কাজ করতে গিয়ে সদস্যরা প্রাণ হারিয়েছেন।কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ এই অভিযানবিশেষজ্ঞদের মতে, অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ (UXO) নিষ্ক্রিয় করা বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ সামরিক ও মানবিক কাজগুলোর একটি। এসব গোলাবারুদ অনেক সময় বছরের পর বছর মাটির নিচে পড়ে থাকে এবং অল্প স্পর্শেই বিস্ফোরিত হতে পারে।জানজান প্রদেশে প্রায় ১,২০০ হেক্টর কৃষিজমি এমন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বলে জানা গেছে। এই জমিগুলোতে চাষাবাদ বা বসতি স্থাপন করতে গেলে মানুষের জীবন হুমকির মুখে পড়ে।একজন স্থানীয় কৃষক, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন,
“আমরা বহুদিন ধরে ভয় নিয়ে কাজ করি। মাটির নিচে কী আছে, কেউ জানে না। মাঝে মাঝে ছোট বিস্ফোরণের শব্দও শোনা যায়।”স্থানীয়দের উদ্বেগ ও প্রতিক্রিয়াঘটনার পর এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। স্থানীয়রা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে তারা অবিস্ফোরিত গোলাবারুদের ঝুঁকিতে বসবাস করছেন, তবে তা অপসারণের কাজ ধীরগতিতে চলছে।একজন বাসিন্দা জানান,
“এ ধরনের দুর্ঘটনা নতুন নয়। তবে এত বড় প্রাণহানির ঘটনা আমাদের আরও ভয় পাইয়ে দিয়েছে। আমরা চাই দ্রুত সব ঝুঁকিপূর্ণ বস্তু সরানো হোক।”অন্যদিকে, কিছু স্থানীয়ের অভিযোগ—নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হলে হয়তো এই ধরনের দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাৎক্ষণিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।আইআরজিসির ভূমিকা ও ঝুঁকিইসলামি রেভ্যলুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) ইরানের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বাহিনী, যারা দেশের নিরাপত্তা ও বিশেষ অভিযান পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।এই বাহিনীর বিশেষায়িত ইউনিটগুলো সাধারণত বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং জরুরি প্রতিক্রিয়া কার্যক্রমে নিয়োজিত থাকে।বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের অভিযানে অংশ নেওয়া সদস্যরা অত্যন্ত প্রশিক্ষিত হলেও ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো সম্ভব নয়। বিশেষ করে পুরনো বা ক্ষতিগ্রস্ত গোলাবারুদ শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে।বড় ধরনের নিরাপত্তা প্রশ্নএই ঘটনার পর ইরানে অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ অপসারণ কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।বিশেষজ্ঞদের মতে:
উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজন রয়েছে
ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজের আগে আরও বিস্তৃত জরিপ জরুরি
আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ানো যেতে পারে
একজন নিরাপত্তা বিশ্লেষক বলেন,
“এই ধরনের দুর্ঘটনা দেখায় যে শুধু মানবসম্পদ নয়, প্রযুক্তিগত সহায়তাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত ডিটেকশন সিস্টেম ব্যবহার করলে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।”প্রশাসনের করণীয় কীএ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে প্রশাসনের জন্য কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ বিবেচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা—
দ্রুত জরিপ ও ম্যাপিং: ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে মানচিত্র তৈরি করা
উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার: ড্রোন ও সেন্সর প্রযুক্তির মাধ্যমে গোলাবারুদ শনাক্ত করা
জনসচেতনতা বৃদ্ধি: স্থানীয়দের সতর্কতা ও নিরাপত্তা সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া
চিকিৎসা প্রস্তুতি: দুর্ঘটনা ঘটলে দ্রুত চিকিৎসা নিশ্চিত করা
এছাড়া আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সহায়তা নেওয়ার কথাও আলোচনায় এসেছে, কারণ অনেক দেশ ইতোমধ্যে এই ধরনের ঝুঁকি মোকাবিলায় সফল অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে।দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবএই দুর্ঘটনা শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি হতে পারে—
কৃষিকাজে বাধা সৃষ্টি
স্থানীয় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব
মানুষের মধ্যে স্থায়ী ভয় ও অনিশ্চয়তা
নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর অতিরিক্ত চাপ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ একটি “নীরব হুমকি”, যা যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু বছর পরও মানুষের জীবন কেড়ে নিতে পারে।উপসংহারজানজান প্রদেশের এই মর্মান্তিক ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, যুদ্ধ বা সংঘাতের প্রভাব কতটা দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ শুধু সামরিক চ্যালেঞ্জ নয়, এটি একটি মানবিক সংকটও।
নিরাপত্তা জোরদার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয়দের সম্পৃক্ততার মাধ্যমে এই ঝুঁকি কমানো সম্ভব—এমনটাই মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে তার জন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ এবং দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর