প্রিন্ট এর তারিখ : ০২ মে ২০২৬ ||
প্রকাশের তারিখ : ০২ মে ২০২৬
সীতাকুণ্ডে সমুদ্রে গোসলে নেমে প্রাণ গেল যুবকের, তীব্র স্রোতে ভেসে মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিবেদক ||
চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতে বন্ধুদের সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে এক মর্মান্তিক ঘটনার শিকার হলেন এক তরুণ। গোসল করতে নেমে হঠাৎ তীব্র স্রোতে ভেসে গিয়ে প্রাণ হারান ২১ বছর বয়সী মো. মেহরাজ হোসেন। ঘটনাটি স্থানীয়দের মধ্যে শোকের ছায়া ফেলেছে এবং সমুদ্রসৈকতে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
ঘটনাস্থলে যা ঘটেছিল
শুক্রবার (১ মে) বিকেল ৫টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতের ফেরিঘাট সংলগ্ন এলাকায় এই দুর্ঘটনা ঘটে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিকেলের দিকে মেহরাজ হোসেন তার বন্ধু সাব্বির আরমানসহ কয়েকজন মিলে সমুদ্রসৈকতে বেড়াতে যান। আবহাওয়া তখন তুলনামূলক শান্ত থাকলেও সমুদ্রের ভেতরে স্রোত ছিল প্রবল।
একপর্যায়ে তারা সমুদ্রে গোসল করতে নামেন। প্রথমে সবকিছু স্বাভাবিক থাকলেও হঠাৎ করেই তীব্র স্রোত তাদের টেনে নিয়ে যায় গভীরের দিকে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
সাব্বির আরমানকে স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার করতে পারলেও মেহরাজ তখন পানির নিচে তলিয়ে যান। তাকে আর চোখে দেখা যাচ্ছিল না।
উদ্ধার অভিযান ও শেষ চেষ্টা
ঘটনার পরপরই স্থানীয় জেলেরা এবং আশপাশের লোকজন উদ্ধারকাজে নেমে পড়েন। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে খোঁজাখুঁজি। সন্ধ্যার দিকে অবশেষে মেহরাজকে উদ্ধার করা হয়। তবে তখন তার শারীরিক অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন ছিল বলে জানা গেছে।
স্থানীয়দের সহায়তায় দ্রুত তাকে সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। কিন্তু কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, হাসপাতালে আনার আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।
সীতাকুণ্ড উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসক ডা. আলতাফ হোসেন বলেন, “সমুদ্রে ভেসে যাওয়া এক যুবককে হাসপাতালে আনা হয়েছিল। পরীক্ষা করে দেখা যায়, হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই তার মৃত্যু হয়েছে।”
পরিবার ও এলাকার শোক
মেহরাজ হোসেন চট্টগ্রাম শহরের পূর্ব মাদারবাড়ী এলাকার বাসিন্দা। তার বাবা মোহাম্মদ মোশারফ আলী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তান ছিলেন বলে জানা গেছে।
স্থানীয় এক বাসিন্দা, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক, বলেন—
“ছেলেটা খুব ভালো ছিল। বন্ধুদের সঙ্গে একটু আনন্দ করতে গিয়েই এমন দুর্ঘটনা! পরিবারের জন্য এটা অপূরণীয় ক্ষতি।”
এ ঘটনায় এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা জানান, এমন আকস্মিক মৃত্যু কেউ মেনে নিতে পারছেন না।
সমুদ্রসৈকতে নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন
এই ঘটনার পর বাঁশবাড়িয়া সমুদ্রসৈকতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সৈকতে পর্যাপ্ত সতর্কবার্তা বা লাইফগার্ড না থাকায় এমন দুর্ঘটনা প্রায়ই ঘটে।
একজন স্থানীয় জেলে বলেন—
“এই এলাকায় স্রোত অনেক সময় হঠাৎ বেড়ে যায়। বাইরের লোকজন সেটা বুঝতে পারে না। যদি সতর্কতা বোর্ড থাকত বা লাইফগার্ড থাকত, তাহলে হয়তো এমন ঘটনা কমত।”
তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাদের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কেন এমন দুর্ঘটনা ঘটে?
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের পানিতে ‘রিপ কারেন্ট’ বা তীব্র স্রোত হঠাৎ তৈরি হতে পারে, যা খুব দ্রুত মানুষকে গভীরের দিকে টেনে নেয়। যারা সমুদ্র সম্পর্কে অভিজ্ঞ নয়, তারা সহজেই এর শিকার হন।
বিশেষ করে জোয়ার-ভাটার সময় কিংবা আবহাওয়ার পরিবর্তনের সময় এই ধরনের স্রোত বেশি দেখা যায়। কিন্তু অধিকাংশ পর্যটক এ বিষয়ে সচেতন না থাকায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে।
প্রয়োজন সচেতনতা ও ব্যবস্থা
এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন স্থানীয়রা—
সৈকতে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন
প্রশিক্ষিত লাইফগার্ড নিয়োগ
বিপজ্জনক এলাকাগুলো চিহ্নিত করা
পর্যটকদের জন্য সচেতনতামূলক প্রচারণা
স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ থাকলে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক ঘটনা কমানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
উপসংহার
বন্ধুদের সঙ্গে এক বিকেলের আনন্দঘন মুহূর্ত মুহূর্তেই পরিণত হলো শোকাবহ ঘটনায়। মেহরাজ হোসেনের মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের নয়, পুরো এলাকার জন্যই বড় একটি ক্ষতি। সমুদ্রের সৌন্দর্যের পাশাপাশি তার অদৃশ্য বিপদের কথাও মনে রাখা জরুরি। সচেতনতা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া এমন দুর্ঘটনা থামানো কঠিন—এই ঘটনাই যেন আবার সেই বাস্তবতাকে সামনে এনে দিল।
প্রকাশক ও সম্পাদকঃ মোঃ সাদ্দাম হোসেন
নির্বাহী সম্পাদকঃ মোঃ হাবিব
বার্তা সম্পাদকঃ মোঃ আব্দুর কাদের জিলানী
বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিতেঃ 01860-519390
কপিরাইট © ২০২৬ দৈনিক জাতীয় কণ্ঠস্বর